শতবর্ষের আলোকে সুকান্ত ভট্টাচার্য | বাংলা প্রবন্ধ রচনা

Arindam Saha

Published On:

আজকে তোমাদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য শতবর্ষের আলোকে সুকান্ত ভট্টাচার্য – প্রবন্ধ রচনা তুলে ধরা হলো। এই প্রবন্ধটি পরীক্ষার দৃষ্টিভঙ্গিতে লেখা, যাতে অল্প সময়ে মূল বিষয়গুলো পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় এবং উত্তর লেখার ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাস বাড়ে। তাই মনোযোগ দিয়ে পড়ো—চাইলে এখান থেকেই পড়ে নিতে পারো, আবার প্রয়োজন হলে সংগ্রহ করেও রাখতে পারো।

শতবর্ষের আলোকে সুকান্ত ভট্টাচার্য

বাংলা সাহিত্যে কিছু নাম সময়ের সীমা অতিক্রম করে চিরকাল জীবন্ত হয়ে থাকে। তাঁদের লেখা শুধু সাহিত্য নয়, বরং একটি যুগের সামাজিক ও রাজনৈতিক সত্যের দলিল। সুকান্ত ভট্টাচার্য তেমনই এক নাম। মাত্র উনিশ বছরের স্বল্প জীবনে তিনি যে কবিতা রেখে গেছেন, তা আজ তাঁর জন্মশতবর্ষেও একই রকম তীক্ষ্ণ, প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয়। দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ, শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে তাঁর কলম ছিল আগুনের মতো—যা আজও সমাজকে প্রশ্ন করতে শেখায়।

জন্ম, বংশ ও শৈশব

১৯২৬ সালের ১৫ই আগস্ট দক্ষিণ কলকাতার মহিম হালদার স্ট্রিটে মামার বাড়িতে সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্ম। পিতা নিবারণ ভট্টাচার্য এবং মাতা সুনীতা দেবী। পারিবারিক সচ্ছলতা তাঁর জীবনে ছিল না। অল্প বয়সেই মাকে হারিয়ে জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে। এই অভাব ও বেদনাই ধীরে ধীরে তাঁর চিন্তা ও চেতনাকে গভীর করে তোলে। ছোটবেলা থেকেই লেখালেখির ঝোঁক ছিল—হাতেলেখা পত্রিকা ও ছোট কাগজে তাঁর প্রথম সাহিত্যচর্চা শুরু।

Read More:  বেগম রোকেয়া – জীবনী রচনা | Begum Rokeya Jiboni

শিক্ষা ও রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ

বেলেঘাটা দেশবন্ধু হাই স্কুলে পড়ার সময় সুকান্ত ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। সেই সময় দেশ জুড়ে স্বাধীনতা আন্দোলন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব এবং ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ বাংলাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। রাস্তায় পড়ে থাকা মৃতদেহ, ক্ষুধার্ত মানুষের আর্তনাদ, শ্রমিকের শোষণ—এই সবকিছু তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন। পড়াশোনায় নিয়মিত থাকা সম্ভব হয়নি, প্রবেশিকা পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন। কিন্তু এই অভিজ্ঞতাই তাঁকে তৈরি করে এক সচেতন, প্রতিবাদী কবি হিসেবে।

সাহিত্য সৃষ্টি ও কাব্যচিন্তা

সুকান্তের রচনার সংখ্যা খুব বেশি নয়, কিন্তু তার গভীরতা ও শক্তি বাংলা সাহিত্যে বিরল। ছাড়পত্র, পূর্বাভাস, ঘুমিয়ে পড়া, মিঠাইওয়ালা—এই গ্রন্থগুলিতে তাঁর কাব্যচিন্তার পরিচয় মেলে। তাঁর কবিতায় প্রধানত তিনটি সুর লক্ষ করা যায়—

১) দুর্ভিক্ষ ও অনাহার:
“ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়”—এই পংক্তির মাধ্যমে তিনি ক্ষুধার নির্মম বাস্তবতাকে নগ্নভাবে তুলে ধরেছেন।
২) বিপ্লব ও সংগ্রাম:
সমাজ বদলানোর ডাক তাঁর কবিতায় বারবার ধ্বনিত হয়েছে—“এবার ভাঙো, এবার গড়ো”—এই আহ্বান আজও তরুণদের নাড়া দেয়।
৩) সাম্য ও মানবিকতা:
শোষিত মানুষের পক্ষে দাঁড়ানোই ছিল তাঁর কাব্যের মূল লক্ষ্য।

দুর্ভিক্ষ পীড়িত মানুষের প্রতিচ্ছবি

বাংলার দুর্ভিক্ষ সুকান্তের কবিতার কেন্দ্রে অবস্থান করে। ‘নিরন্ন মা’-র মতো চরিত্রে তিনি অনাহারে কাতর মানুষের অসহায়তা তুলে ধরেছেন। সন্তানের মুখে একমুঠো খাবার তুলে দেওয়ার আকুতি, সমাজের নিষ্ঠুর উদাসীনতা—এই সবকিছু তাঁর কবিতায় চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে। সুকান্তের কলম কাঁদে না; সে প্রশ্ন তোলে, আঘাত করে, প্রতিবাদ জানায়। এখানেই তিনি অন্য কবিদের থেকে আলাদা।

Read More:  নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু প্রবন্ধ রচনা | Netaji Subhash Chandra Bose Rochona

শতবর্ষেও সুকান্ত কেন প্রাসঙ্গিক

আজও সমাজে দারিদ্র্য, বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি ও বৈষম্য বিদ্যমান। অনাহার পুরোপুরি দূর হয়নি, শ্রমিকের শোষণ বন্ধ হয়নি। তাই সুকান্তের কবিতা কেবল অতীতের স্মৃতি নয়—বর্তমানেরও আয়না। যুবসমাজ আজও পথ খোঁজে, আর সেই পথে সুকান্তের সংগ্রামের ডাক আজও প্রেরণা জোগায়।

উপসংহার

জন্মশতবর্ষে ফিরে তাকালে বোঝা যায়, সুকান্ত ভট্টাচার্য শুধু একজন কবি নন—তিনি বাংলার এক অগ্নিপথিক। মাত্র উনিশ বছরে তিনি যে দীপ্ত আলোর রেখা এঁকে গেছেন, তা শতবর্ষ পেরিয়েও ম্লান হয়নি। বরং সময় যত এগোচ্ছে, তাঁর কবিতা তত বেশি জরুরি হয়ে উঠছে। সত্যিই, সুকান্ত নামটি আজ এক বিশ্বাস, এক সংগ্রাম এবং এক অমর কবিত্বের প্রতীক।

Leave a Comment