বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচনা ও জীবনকথা: সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধ রচনা (সহজ ভাষায়)

Arindam Saha

Published On:

আজকের এই পোস্টে তোমাদের পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়–প্রবন্ধ রচনা সংক্ষিপ্ত ও সহজ ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় এই বিষয়টি বারবার আসে, তাই প্রস্তুতির দিক থেকে এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে বঙ্কিমচন্দ্রের জীবন, সাহিত্যকীর্তি ও বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করা হয়েছে, যাতে অল্প সময়ে বিষয়টি সহজে মনে রাখা যায়। পরীক্ষার আগে দ্রুত রিভিশনের জন্য এই প্রবন্ধটি পড়ে নেওয়া বা সংগ্রহ করে রাখা তোমাদের জন্য উপকারী হবে।

প্রবন্ধ রচনা: সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যের নবজাগরণের ইতিহাসে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এক ধ্রুবতারা। বাংলা গদ্য যখন হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগোচ্ছিল, ঠিক সেই সময় বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর জাদুকরী লেখনীর স্পর্শে বাংলা সাহিত্যকে সাবলীল, গম্ভীর এবং শিল্পসম্মত রূপ দান করেন। তিনি কেবল একজন ঔপন্যাসিক ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাঙালি জাতির ঋষি ও পথপ্রদর্শক। তাঁর হাত ধরেই বাংলা উপন্যাস বিশ্বসাহিত্যের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল। তাই তাঁকে যথার্থই ‘সাহিত্য সম্রাট’ এবং বাংলা গদ্যের ‘ভগীরথ’ বলা হয়।

জন্ম ও বংশপরিচয়

১৮৩৮ খ্রিস্টাব্দের ২৬শে জুন (১৩ আষাঢ়, ১২৪৫ বঙ্গাব্দ), উত্তর ২৪ পরগনা জেলার নৈহাটির নিকটবর্তী কাঁঠালপাড়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত ব্রাহ্মণ পরিবারে বঙ্কিমচন্দ্র জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা যাদবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন মেদিনীপুরের ডেপুটি কালেক্টর এবং মাতা দুর্গাসুন্দরী দেবী ছিলেন এক ধর্মপরায়ণা নারী। বঙ্কিমচন্দ্র ছিলেন তাঁর পিতা-মাতার তৃতীয় সন্তান। শৈশব থেকেই সম্ভ্রান্ত পারিবারিক পরিবেশ এবং সাংস্কৃতিক আবহাওয়া তাঁর মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

Read More:  বেগম রোকেয়া – জীবনী রচনা | Begum Rokeya Jiboni

মেধাবী ছাত্রজীবন

বঙ্কিমচন্দ্রের মেধা ছিল অত্যন্ত প্রখর। গ্রাম্য পাঠশালায় তাঁর বিদ্যারম্ভ হয়, যেখানে তিনি খুব অল্প সময়েই অসামান্য ব্যুৎপত্তি দেখান। এরপর তিনি মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুল এবং পরে হুগলি মহসীন কলেজে পড়াশোনা করেন। পরবর্তীকালে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। ১৮৫৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম যে দুজন ছাত্র বি.এ (স্নাতক) পাশ করেছিলেন, বঙ্কিমচন্দ্র ছিলেন তাঁদের অন্যতম। ছাত্রজীবনেই তাঁর সাহিত্য ও জ্ঞানের প্রতি গভীর অনুরাগ লক্ষ্য করা গিয়েছিল।

বিচিত্র কর্মজীবন

পড়াশোনা শেষ করার পর মাত্র ২০ বছর বয়সে তিনি ব্রিটিশ সরকারের অধীনে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেন। দীর্ঘ প্রায় ৩৩ বছর তিনি যশোর, মেদিনীপুর, খুলনা, মুর্শিদাবাদ ও আলিপুরসহ বিভিন্ন জেলায় অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। সরকারি উচ্চপদে থেকেও তিনি সবসময় নিজের আত্মসম্মান বজায় রেখে চলতেন এবং বহুবার ব্রিটিশ শাসকদের অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছিলেন। ১৮৯১ সালে তিনি সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

পারিবারিক ও বৈবাহিক জীবন

বঙ্কিমচন্দ্রের ব্যক্তিগত জীবনে সুখ ও দুঃখের দোলাচল ছিল। অতি অল্প বয়সে মোহিনী দেবীর সঙ্গে তাঁর প্রথম বিবাহ হয়, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত অল্পদিনের মধ্যেই পত্নীবियोग ঘটে। পরবর্তীকালে তিনি রাজলক্ষ্মী দেবীর সঙ্গে দ্বিতীয়বার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। কর্মব্যস্ততা এবং পারিবারিক জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যেও তিনি সাহিত্য সাধনা থেকে কখনও বিচ্যুত হননি।

অসামান্য সাহিত্যকীর্তি

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজের স্বাক্ষর রেখেছেন। তাঁর সাহিত্যজীবনকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়:

  • উপন্যাস: ১৮৬৫ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম সার্থক উপন্যাস ‘দুর্গেশনন্দিনী’ বাংলা সাহিত্যের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এরপর একে একে তিনি রচনা করেন—‘কপালকুণ্ডলা’, ‘মৃণালিনী’, ‘বিষবৃক্ষ’, ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’, ‘চন্দ্রশেখর’, ‘রাজসিংহ’, ‘দেবী চৌধুরানী’ ইত্যাদি।
  • স্বদেশপ্রেম ও আনন্দমঠ: তাঁর রচিত ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসটি পরাধীন ভারতে বিপ্লবীদের কাছে গীতার মতো পবিত্র ছিল। এই উপন্যাসের ‘বন্দে মাতরম’ গানটি পরবর্তীকালে ভারতের জাতীয় স্তোত্রের মর্যাদা পায় এবং স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মূল মন্ত্র হয়ে ওঠে।
  • প্রবন্ধ ও রসবোধ: উপন্যাস ছাড়াও তিনি ছিলেন একজন শ্রেষ্ঠ প্রাবন্ধিক। ‘কমলাকান্তের দপ্তর’, ‘লোকরহস্য’, ‘কৃষ্ণচরিত্র’, ‘সাম্য’ ইত্যাদি গ্রন্থে তাঁর সমাজভাবনা, যুক্তিবোধ ও সূক্ষ্ম রসবোধের পরিচয় পাওয়া যায়।
  • বঙ্গদর্শন পত্রিকা: ১৮৭২ সালে তিনি ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকা সম্পাদনা শুরু করেন, যা তৎকালীন বাঙালি লেখকদের এক নতুন গোষ্ঠী তৈরি করতে সাহায্য করেছিল।
Read More:  বিশ্ব উষ্ণায়ন প্রবন্ধ রচনা Class 12 | প্রবন্ধ রচনা: বিশ্বায়ন

সম্মান ও স্বীকৃতি

সাহিত্য ও কর্মজীবনে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ১৮৯১ সালে ‘রায়বাহাদুর’ উপাধিতে ভূষিত করে। পরবর্তীকালে ১৮৯৪ সালে তাঁকে ‘সি.আই.ই’ (Companion of the Indian Empire) খেতাব প্রদান করা হয়। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় পুরস্কার হলো বাঙালি পাঠকের অকুন্ঠ ভালোবাসা।

জীবনাবসান

শেষ জীবনে বহুমূত্র রোগে আক্রান্ত হয়ে ১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দের ৮ই এপ্রিল এই মহান মনিষীর জীবনাবসান ঘটে। তাঁর মৃত্যুতে বাংলা সাহিত্যের একটি উজ্জ্বল অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।

উপসংহার

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কেবল অতীতের সাহিত্যিক নন, তিনি আজও সমান প্রাসঙ্গিক। তিনি আমাদের শিখিয়েছিলেন কীভাবে নিজের ভাষাকে ভালোবাসতে হয় এবং কীভাবে দেশকে ভালোবাসতে হয়। তাঁর সৃষ্টিশীল সাহিত্যকর্ম এবং দেশপ্রেমের আদর্শ আজও জাতিকে পথ দেখায়। যুগান্তকারী এই সাহিত্যস্রষ্টা কালের সীমানা ছাড়িয়ে বাঙালির হৃদয়ে চিরকাল অমর হয়ে থাকবেন।

শিক্ষা সংক্রান্ত আপডেট, সরকারি ও বেসরকারি চাকরির খবর, পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি এবং প্রয়োজনীয় স্টাডি মেটিরিয়াল—সবকিছু এক জায়গায়, নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্যভাবে পেতে আমাদের ওয়েবসাইট karmasangsthan24.in নিয়মিত ফলো করুন।

তা ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ নোটিস ও দ্রুত আপডেট মিস না করতে আমাদের WhatsApp ও Telegram গ্রুপে যুক্ত থাকুন।

Leave a Comment