নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু প্রবন্ধ রচনা | Netaji Subhash Chandra Bose Rochona

Arindam Saha

Published On:

আজকে তোমাদের পরীক্ষার জন্য নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু – জীবনী রচনা তুলে ধরা হলো, যা মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতিতে অত্যন্ত সহায়ক। নেতাজির জীবন, আদর্শ ও দেশপ্রেমমূলক কর্মধারা থেকে প্রায়ই পরীক্ষায় প্রশ্ন আসে। তাই বিষয়টিকে সহজ, তথ্যভিত্তিক ও পরীক্ষার উপযোগী ভাষায় উপস্থাপন করা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা চাইলে এখান থেকে রচনাটি পড়ে নিতে পারে অথবা নোট হিসেবে সংগ্রহ করে রাখতে পারে।

প্রবন্ধ রচনা: দেশনায়ক নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক উজ্জ্বলতম নক্ষত্রের নাম নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। পরাধীনতার অন্ধকার আকাশে তিনি ছিলেন এক ধুমকেতু, যিনি নিজের জীবন দিয়ে ভারতবাসীর মনে স্বাধীনতার স্বপ্ন জাগিয়েছিলেন। তিনি কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন পরাধীন ভারতের মুক্তি-সূর্য। তাঁর মন্ত্র ছিল— “তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব।” দেশমাতার এই বীর সন্তান নিজের সবটুকু সুখ বিসর্জন দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন যে, দাসত্বের শৃঙ্খল ভাঙার জন্য সাহসের প্রয়োজন, আপোষের নয়।

জন্ম ও বংশপরিচয়

১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দের ২৩শে জানুয়ারি, ওড়িশার কটক শহরে এক সম্ভ্রান্ত বাঙালি পরিবারে সুভাষচন্দ্র জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা জানকীনাথ বসু ছিলেন কটকের একজন লব্ধপ্রতিষ্ঠ সরকারি আইনজীবী এবং মাতা ছিলেন বিদুষী ও ধর্মপরায়ণা নারী প্রভাবতী দেবী। জানকীনাথের পৈতৃক নিবাস ছিল দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার কোদালিয়া গ্রামে (বর্তমান নাম সুভাষগ্রাম)। পিতা-মাতার উদার মানসিকতা, ধর্মীয় চেতনা এবং দেশপ্রেমের আবহে ছোট্ট সুভাষের বেড়ে ওঠা। তাঁর জন্মের মধ্য দিয়েই যেন পরাধীন ভারতে বিদ্রোহের এক নবজাগরণ সূচিত হয়েছিল।

Read More:  বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচনা ও জীবনকথা: সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধ রচনা (সহজ ভাষায়)

মেধাবী ছাত্রজীবন

সুভাষচন্দ্রের মেধা ছিল বিস্ময়কর। বাল্যকালে কটকের প্রোটেস্ট্যান্ট ইউরোপিয়ান স্কুলে তাঁর শিক্ষারম্ভ হয়। মেধাবী হলেও সেই স্কুলে ভারতীয় ছাত্রদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ তাঁকে ব্যথিত করত। পরে তিনি র‍্যাভেনশ কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে ১৯১৩ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। সেখানে ইংরেজ অধ্যাপক ওটেন সাহেব ভারতীয় ছাত্রদের অপমান করলে সুভাষচন্দ্র তার তীব্র প্রতিবাদ করেন। এই ‘অন্যায়কে মেনে না নেওয়ার’ অপরাধে তাঁকে কলেজ থেকে বহিষ্কৃত হতে হয়। পরে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের প্রচেষ্টায় তিনি স্কটিশ চার্চ কলেজে ভর্তি হন এবং দর্শনে অনার্সসহ বি.এ পাশ করেন।

আই.সি.এস ও ত্যাগের আদর্শ

পিতার ইচ্ছায় ১৯১৯ সালে তিনি বিলেতে যান সিভিল সার্ভিস (ICS) পরীক্ষা দেওয়ার জন্য। মাত্র কয়েক মাসের প্রস্তুতিতে তিনি সেই কঠিন পরীক্ষায় চতুর্থ স্থান অধিকার করেন। ইংরেজিতে তিনি ইংরেজদেরও পেছনে ফেলে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছিলেন। কিন্তু বিলেতের সুখ, সরকারি উচ্চপদ এবং বিপুল ঐশ্বর্য—কোনোকিছুই তাঁকে বাঁধতে পারল না। তিনি ভাবলেন, যে ইংরেজ সরকার আমার দেশকে পরাধীন করে রেখেছে, তাদের গোলামি করা সাজে না। তাই তিনি ঘৃণাভরে সেই চাকরি প্রত্যাখ্যান করে দেশে ফিরে এলেন এবং নিজেকে দেশমাতৃকার চরণে উৎসর্গ করলেন।

রাজনৈতিক জীবন ও সংগ্রাম

দেশে ফিরে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসকে তিনি নিজের রাজনৈতিক গুরু হিসেবে গ্রহণ করেন। দেশবন্ধুর নির্দেশে তিনি জাতীয় কংগ্রেসের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন এবং ‘স্বরাজ’ পত্রিকার প্রচারভার গ্রহণ করেন। তাঁর দক্ষতায় তিনি কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ভয় পেত, তাই বারবার তাঁকে জেলে পাঠানো হয়েছে। ১৯৩৮ সালে হরিপুরা ও ১৯৩৯ সালে ত্রিপুরী কংগ্রেসে তিনি সভাপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে মতপার্থক্যের কারণে তিনি কংগ্রেস ত্যাগ করেন এবং আপোষহীন সংগ্রামের লক্ষ্যে ‘ফরোয়ার্ড ব্লক’ গঠন করেন।

Read More:  ঋত্বিক ঘটক প্রবন্ধ রচনা Class 12 | ঋত্বিক ঘটক জীবনী রচনা

মহানিষ্ক্রমণ ও আজাদ হিন্দ ফৌজ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ব্রিটিশ সরকার সুভাষচন্দ্রকে তাঁর এলগিন রোডের বাড়িতে গৃহবন্দি করে রাখে। কিন্তু সিংহের খাঁচা কি সিংহকে আটকে রাখতে পারে? ১৯৪১ সালের ১৭ই জানুয়ারি গভীর রাতে জিয়াউদ্দিনের ছদ্মবেশে পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে তিনি ভারত ত্যাগ করেন। একেই বলা হয় ‘মহানিষ্ক্রমণ’। কাবুল ও রাশিয়া হয়ে তিনি পৌঁছান জার্মানিতে। সেখান থেকে সাবমেরিনে করে জাপানে গিয়ে বিপ্লবী রাসবিহারী বসুর হাত থেকে তিনি ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’-এর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনিই হলেন ফৌজের সর্বাধিনায়ক বা ‘নেতাজি’। প্রবাসী ভারতীয়দের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বজ্রকন্ঠে ডাক দিলেন— “দিল্লি চলো”

স্বাধীনতার শেষ যুদ্ধ

সুভাষচন্দ্রের নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ বাহিনী প্রবল পরাক্রমে ইংরেজ ও আমেরিকান বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ১৯৪৪ সালে তাঁর বাহিনী ভারতের মাটিতে প্রবেশ করে এবং ইম্ফল ও কোহিমায় তেরঙ্গা পতাকা উত্তোলন করে। তিনি আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জকে ব্রিটিশদের হাত থেকে মুক্ত করে তার নাম দেন ‘শহিদ’ ও ‘স্বরাজ’ দ্বীপ। অর্থের অভাব, খাদ্যের অভাব—কোনোকিছুই তাঁর সৈন্যদের মনোবল ভাঙতে পারেনি। তাঁর ‘জয় হিন্দ’ ধ্বনি সারা ভারতে স্বাধীনতার জোয়ার এনেছিল।

অন্তর্ধান ও মৃত্যু-রহস্য

আজাদ হিন্দ ফৌজের ব্যর্থতার পর তিনি বিমানে জাপানের উদ্দেশ্যে রওনা হন। শোনা যায়, ১৯৪৫ সালের ১৮ই আগস্ট তাইহোকু বিমান বন্দরে এক দুর্ঘটনায় তিনি নিহত হন। কিন্তু ভারতবাসী এই সংবাদ আজও মন থেকে মেনে নিতে পারেনি। কোনো কোনো ঐতিহাসিক মনে করেন, তিনি হয়তো রাশিয়ার পথে পাড়ি দিয়েছিলেন। এই মৃত্যু বা অন্তর্ধান আজও এক গভীর রহস্য।

Read More:  শতবর্ষে নারায়ণ দেবনাথ প্রবন্ধ রচনা | নারায়ন দেবনাথ এর জীবনী রচনা

উপসংহার

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু কেবল একটি নাম নয়, তিনি একটি চেতনা। তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন, কীভাবে মাথা উঁচু করে বাঁচতে হয়। তিনি বেঁচে আছেন কি নেই, তা বড় কথা নয়; বড় কথা হলো তাঁর আদর্শ আজও প্রতিটি ভারতীয়ের রক্তে প্রবাহিত। তিনি আমাদের ‘নেতাজি’, আমাদের হৃদয়ের সম্রাট। কবির ভাষায় বলতে হয়— “জয় হিন্দ’ যার জীবনমন্ত্র, দেশসেবা যা’র কাম, ভারত-মাতার বীর সন্তান, নেতাজি তাহার নাম।”

শিক্ষা সংক্রান্ত আপডেট, সরকারি ও বেসরকারি চাকরির খবর, পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি এবং প্রয়োজনীয় স্টাডি মেটিরিয়াল—সবকিছু এক জায়গায়, নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্যভাবে পেতে আমাদের ওয়েবসাইট karmasangsthan24.in নিয়মিত ফলো করুন। তা ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ নোটিস ও দ্রুত আপডেট মিস না করতে আমাদের WhatsApp ও Telegram গ্রুপে যুক্ত থাকুন।

Leave a Comment