মাধ্যমিক ভূগোল বহির্জাত প্রক্রিয়া ও তাদের দ্বারা সৃষ্ট ভূমিরূপ প্রথম অধ্যায় প্রশ্ন ও উত্তর

Arindam Saha

Published On:

আজকের পোস্টে মাধ্যমিক (Class 10) ভূগোল এর প্রথম অধ্যায় বহির্জাত প্রক্রিয়া ও তাদের দ্বারা সৃষ্ট ভূমিরূপ থেকে সব ধরনের প্রশ্ন উত্তর একসাথে এক পোস্টে দেওয়া হল। যেগুলি তোমাদের পরীক্ষার প্রস্তুতির ক্ষেত্রে বিশেষ ভাবে সহায়তা করবে। এখানে ১/২/৩/৫ নম্বর এর প্রশ্ন ও উত্তর সহজ ভাষায় করে দেওয়া হয়েছে।

বহির্জাত প্রক্রিয়া ও সৃষ্ট ভূমিরূপ প্রশ্ন উত্তর (MCQ/SAQ/LAQ)

বহির্জাত প্রক্রিয়া ও সৃষ্ট ভূমিরূপ class 10 অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর (১ নম্বর)

১। প্রাকৃতিক ভূ-দৃশ্য কাকে বলে?

উত্তর: সমভূমি, মালভূমি, পাহাড়, পর্বত প্রভৃতিকে প্রাকৃতিক ভূ-দৃশ্য বলে।

২। ভূমিরূপ গঠনকারী প্রক্রিয়া কয় প্রকার ও কী কী?

উত্তর: দুই প্রকার। যথা- পার্থিব প্রক্রিয়া ও মহাজাগতিক প্রক্রিয়া।

৩। বহির্জাত প্রক্রিয়ার শক্তি বলতে কী বোঝ?

উত্তর: বহির্জাত প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী প্রাকৃতিক শক্তিগুলিকে (যেমন নদী, বায়ু, হিমবাহ) বহির্জাত প্রক্রিয়ার শক্তি বলে।

৪। অবরোহণ প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রকগুলি কী কী?

উত্তর: অবরোহণ প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রকগুলি হলো নদী, বায়ু এবং হিমবাহ।

৫। নদীর জলের প্রধান উৎস কী?

উত্তর: নদীর জলের উৎস হলো বৃষ্টির জল ও বরফগলা জল।

৬। নদীর নিম্নগতির অপর নাম কী?

উত্তর: নিম্নগতির অপর নাম হলো বদ্বীপ প্রবাহ।

৭। নদীর ক্ষয়কার্য কোন গতিতে সম্পন্ন হয়?

উত্তর: নদীর ক্ষয়কার্য প্রধানত উচ্চগতিতে সম্পন্ন হয়।

৮। পৃথিবীর বৃহত্তম গিরিখাত বা ক্যানিয়ন কোনটি?

উত্তর: আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো নদীর গ্র্যাণ্ড ক্যানিয়ন পৃথিবীর বৃহত্তম গিরিখাত।

৯। পৃথিবীর অন্যতম গভীরতম গিরিখাত কোনটি?

উত্তর: পেরু দেশের এল-কানন-দ্য কলকা হলো পৃথিবীর গভীরতম গিরিখাত।

১০। পৃথিবীর উচ্চতম জলপ্রপাতের নাম কী?

উত্তর: ভেনিজুয়েলার কারাও নদীর শাখাপথে অবস্থিত সাল্টো অ্যাঞ্জেল জলপ্রপাত।

১১। ভারতের উচ্চতম জলপ্রপাত কোনটি?

উত্তর: কর্ণাটক রাজ্যের অন্তর্গত সরাবতী নদীর গেরসোপ্পা বা যোগ জলপ্রপাত।

১২খরস্রোত কাকে বলে?

উত্তর: বেশি ঢাল বিশিষ্ট জলপ্রপাতকে খরস্রোত বলে।

১৩। কাসকেড কী?

উত্তর: নদীর প্রবাহপথে ধাপে ধাপে নেমে আসা জলপ্রপাতের নাম কাসকেড।

১৪ভারতের বৃহত্তম নদীদ্বীপ কোনটি?

উত্তর: ব্রহ্মপুত্র নদের বুকে অবস্থিত মাজুলী দ্বীপ হলো ভারতের বৃহত্তম নদীদ্বীপ।

১৫। পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ কোনটি?

উত্তর: গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র নদীর মিলিত ব-দ্বীপ হলো পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ।

১৬। সুন্দরবনে কী জাতীয় অরণ্য দেখা যায়?

উত্তর: সুন্দরবনে ম্যানগ্রোভ জাতীয় অরণ্য দেখা যায়।

১৭। পৃথিবীর দীর্ঘতম নদীটির নাম কী?

উত্তর: পৃথিবীর দীর্ঘতম নদীটির নাম নীলনদ।

১৮দক্ষিণ ভারতের দীর্ঘতম নদীর নাম কী?

উত্তর: দক্ষিণ ভারতের দীর্ঘতম নদীর নাম গোদাবরী।

১৯। কিউসেক কী?

উত্তর: নদীপ্রবাহ পরিমাপের একককে কিউসেক বলে।

২০। টাইটানিক জাহাজ কবে ডুবে যায়?

উত্তর: ১৯১২ সালে সমুদ্রে ভাসমান হিমশৈলের আঘাতে টাইটানিক জাহাজ ডুবে যায়।

২১। পৃথিবীর বৃহত্তম মহাদেশীয় হিমবাহের নাম কী?

উত্তর: পৃথিবীর বৃহত্তম মহাদেশীয় হিমবাহের নাম ল্যাম্বার্ট।

২২টার্ন কী?

উত্তর: পার্বত্য অঞ্চলে ক্ষয়কার্যের ফলে সৃষ্ট ক্ষুদ্রাকার করিহ্রদকে টার্ন বলে।

২৩কোন অঞ্চলে বায়ুর কাজের প্রাধান্য সর্বাধিক দেখা যায়?

উত্তর: মরু অঞ্চলে বায়ুর কাজের প্রাধান্য সর্বাধিক।

২৪। ভারতের কোথায় ধান্দ দেখা যায়?

উত্তর: রাজস্থানের মরুঅঞ্চলে (থর মরুভূমি) অপসারণ গর্তগুলি ধান্দ নামে পরিচিত।

২৫। ভারতের বৃহত্তম হিমবাহের নাম কী?

উত্তর: ভারতের বৃহত্তম হিমবাহের নাম সিয়াচেন।

বহির্জাত প্রক্রিয়া ও তাদের দ্বারা সৃষ্ট ভূমিরূপ সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর (২ নম্বর)

১। পার্থিব প্রক্রিয়া কাকে বলে?

উত্তর: ভূ-অভ্যন্তরে ও ভূ-পৃষ্ঠের উপরিভাগে যেসকল প্রক্রিয়া ভূমিরূপ গঠনে সক্রিয় থাকে, তাদের পার্থিব প্রক্রিয়া বলে, যেমন- ভূমিকম্প, নদীর কার্য ইত্যাদি।

২। মহাজাগতিক প্রক্রিয়া বলতে কী বোঝ?

উত্তর: উল্কা পতন, জ্যোতিষ্কের টুকরো প্রভৃতি মহাজাগতিক বস্তু দ্বারা যখন পৃথিবীর ভূমিরূপের পরিবর্তন ঘটে, তখন তাকে মহাজাগতিক প্রক্রিয়া বলে।

৩। পুঞ্জিত স্খলন কী?

উত্তর: আবহবিকারের দ্বারা সৃষ্ট শিলাখণ্ড ও আলগা মাটি অভিকর্ষটানের প্রভাবে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নীচের দিকে নেমে আসার ঘটনাকে পুঞ্জিত স্খলন বলে।

৪। ক্ষয়ীভবন কাকে বলে?

উত্তর: চূর্ণ-বিচূর্ণ শিলা ও মাটি বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তি (যেমন নদী, বায়ু) দ্বারা এক স্থান থেকে অন্যত্র অপসারিত হলে তাকে ক্ষয়ীভবন বলে।

৫। নগ্নীভবন কাকে বলে?

উত্তর: পুঞ্জিত স্থালন ও ক্ষয়ীভবন—এই দুই প্রক্রিয়ার ফলে যখন কোনো স্থানের নীচের মূল শিলা নগ্ন বা উন্মুক্ত হয়ে পড়ে, তখন তাকে নগ্নীভবন বলে।

৬। পর্যায়ন প্রক্রিয়া কাকে বলে?

উত্তর: অবরোহণ (ভূমির উচ্চতা হ্রাস) ও আরোহণ (উচ্চতা বৃদ্ধি) প্রক্রিয়া দুটিকে একত্রে পর্যায়ন বলে। এর ফলে অসমতল ভূমি সমতলে পরিণত হয়।

৭। জলবিভাজিকা কাকে বলে?

উত্তর: দুটি নদীর অববাহিকার মধ্যবর্তী উঁচুভূমিকে জলবিভাজিকা বলে। সাধারণত উঁচু পাহাড় বা শৈলশিরা এর কাজ করে, যেমন নর্মদা ও শোেন নদীর জলবিভাজিকা অমরকণ্টক।

৮। আদর্শ নদী কাকে বলে?

উত্তর: যে নদীর প্রবাহে উচ্চগতি, মধ্যগতি ও নিম্নগতি—এই তিনটি গতিই স্পষ্টভাবে দেখা যায় তাকে আদর্শ নদী বলে, উদাহরণস্বরূপ গঙ্গা নদী।

৯। নদীর ঘর্ষণ ক্ষয় বা সংঘাত ক্ষয় কাকে বলে?

উত্তর: নদীর স্রোতের সাথে চলমান বড়ো বড়ো শিলাখণ্ড বা বোল্ডার পরস্পরের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রস্তরখণ্ড ও বালুকণায় পরিণত হওয়াকে ঘর্ষণ ক্ষয় বা সংঘাত ক্ষয় বলে।

১০। ষষ্ঠ ঘাতের সূত্র কী?

উত্তর: কোনো কারণে নদীর গতিবেগ দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেলে, নদীর বহন ক্ষমতা ৬৪ গুণ বৃদ্ধি পায়, ভূগোলে একে ষষ্ঠঘাতের সূত্র বলা হয়।

১১। শৃঙ্খলিত বা আবদ্ধ শৈলশিরা কাকে বলে?

উত্তর: পার্বত্য প্রবাহে নদীর পথে কঠিন শিলার পাহাড় থাকলে নদী তাকে ক্ষয় করতে না পেরে এঁকে বেঁকে প্রবাহিত হয়। অনেকদূর থেকে দেখলে মনে হয় পাহাড়ের প্রান্তগুলি একে অপরের সাথে আবদ্ধ আছে, একে শৃঙ্খলিত শৈলশিরা বলে।

১২প্রপাতকূপ কী?

উত্তর: জলপ্রপাতের জলের সঙ্গে পতিত বড়ো শিলাখণ্ডের প্রবল আঘাতে জলপ্রপাতের পাদদেশে সৃষ্ট বিশালাকার হাঁড়ির মতো গর্তের নাম প্রপাতকূপ।

১৩। অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ কাকে বলে?

উত্তর: সমভূমিতে নদীর দুটি সন্নিহিত বাঁকের মধ্যবর্তী সংকীর্ণ অংশ পার্শ্বক্ষয়ের ফলে যুক্ত হয়ে গেলে নদী সোজা প্রবাহিত হয়। তখন পরিত্যক্ত বাঁকটি ঘোড়ার ক্ষুরের মতো হ্রদ হিসেবে অবস্থান করে, একে অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ বলে।

১৪খাঁড়ি কী?

উত্তর: বদ্বীপ সমভূমি অঙচলে সংকীর্ণ নদীর মতো গভীর নালা যা সরাসরি সমুদ্রের জলের সাথে যুক্ত থাকে এবং জোয়ারের সময় জলে ভরে যায়, তাকে খাঁড়ি বলে।

১৫। দোয়াব কী?

উত্তর: পাশাপাশি প্রবাহিত দুটি নদীর মধ্যবর্তী ভূ-ভাগকে দোয়াব বলে।

১৬। ক্রেভাস কী?

উত্তর: প্রবাহমান হিমবাহের উপরিভাগের বরফপৃষ্ঠে চাপের পার্থক্যের কারণে অনেক সময় যে ফাটল দেখা যায়, সেই ফাটলকে ক্রেভাস বলে।

১৭। বার্গশ্রুন্ড কী?

উত্তর: হিমবাহের বরফে সৃষ্ট ফাটল বা ক্রেভাস সমান্তরাল বা আড়াআড়িভাবে অবস্থান করলে, সেই অতি গভীর ও প্রশস্ত হিমবাহ ফাটলকে বার্গশ্রুন্ড বলে।

১৮পিরামিড চূড়া বা হর্ন কাকে বলে?

উত্তর: পার্বত্য হিমবাহের উচ্চ অংশে কয়েকটি করি বিপরীতমুখী হয়ে অবস্থান করলে তাদের মধ্যবর্তী তীক্ষ্ণ শৃঙ্গটিকে পিরামিডের মত দেখায়, এরূপ চূড়াকে পিরামিড চূড়া বা হর্ন বলে।

১৯। ফিয়র্ড কাকে বলে?

উত্তর: সুমেরু অঞ্চলে হিমবাহের গভীর ক্ষয়কার্য দ্বারা সৃষ্ট বেসিনের গভীরতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে নীচে থাকলে তাতে সমুদ্রের জল প্রবেশ করে। এরূপ জলময় অংশকে ফিয়র্ড বলে।

২০। কেটল হ্রদ কাকে বলে?

উত্তর: অনেক সময় বহিঃধৌত সমভূমির সঞ্চয়ের নিচে বরফের চাঁই চাপা পড়ে গিয়ে বরফ গলে গেলে যে গর্ত সৃষ্টি হয় তাকে কেটল বলে। এই গর্ত জলপূর্ণ হয়ে হ্রদের আকার নিলে তাকে কেটল হ্রদ বলে।

২১। ড্রামলিন কাকে বলে?

উত্তর: হিমবাহ বাহিত শিলাখণ্ড, নুড়ি, বালি প্রভৃতি সঞ্চিত হয়ে উলটানো নৌকা বা উলটানো চামচের মতো দেখতে সমভূমির সৃষ্টি করলে তাকে ড্রামলিন বলে।

২২। অপসারণ গর্ত কাকে বলে?

উত্তর: মরুভূমির যে অংশে ক্ষুদ্রাকার বালি এবং পলি শিথিল অবস্থায় থাকে, সেখান থেকে ওই পদার্থসমূহ শক্তিশালী বায়ুর সাথে অপসারিত হওয়ার ফলে যেসকল ছোট বড় গর্তের সৃষ্টি হয়, তাকে অপসারণ গর্ত বলে।

২৩লোয়েশ সমভূমি কাকে বলে?

উত্তর: বায়ুপ্রবাহের সঙ্গে হলুদ ও ধূসর বর্ণের অতি সূক্ষ্ম খনিজ সমৃদ্ধ পলি ও বালুকণা একস্থান থেকে অন্যস্থানে বাহিত হয়ে সঞ্চিত হয়ে যে সমভূমির সৃষ্টি করে, তাকে লোয়েস সমভূমি বলে।

২৪। ওয়াদি কী?

উত্তর: মরুভূমিতে বৃষ্টির সময়ে সৃষ্ট নদীখাতগুলি শুষ্ক ঋতুতে বাষ্পীভবন ও অনুপ্রবেশের ফলে শুকিয়ে যায়। তখন ওই গভীর শুষ্ক নদীখাতকে ওয়াদি বলে।

২৫। প্লায়া কাকে বলে?

উত্তর: মরুভূমি অঞ্চলে বেসিনের চারপাশের পর্বতগুলি থেকে নদীর জল কেন্দ্রমুখী প্রবাহের কারণে অবনত অংশে জমা হয়ে যে লবণাক্ত হ্রদ সৃষ্টি হয়, তাকে প্লায়া বলে।

দশম শ্রেণীর ভূগোল প্রথম অধ্যায় (বহির্জাত প্রক্রিয়া ও তাদের দ্বারা সৃষ্ট ভূমিরূপ) প্রশ্ন ও উত্তর (৩ নম্বর)

১। বহির্জাত প্রক্রিয়ার বৈশিষ্ট্যগুলি লেখো।

উত্তর: বহির্জাত প্রক্রিয়ার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হলো:

(ক) এই প্রক্রিয়া প্রধানত ভূ-পৃষ্ঠ এবং উপপৃষ্ঠীয় অংশে কাজ করে এবং এটি একটি অতি ধীর প্রক্রিয়া ।

(খ)জলবায়ু ও শিলার গঠনের তারতম্যের কারণে পৃথিবীর এক এক অঞ্চলে এক একটি শক্তি বেশি সক্রিয় থাকে। যেমন- মরু অঞ্চলে বায়ুশক্তি এবং মেরু অঞ্চলে হিমবাহ শক্তি প্রধান ভূমিকা পালন করে ।

(গ) আর্দ্র অঞ্চলে বহির্জাত প্রক্রিয়ায় সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে নদী শক্তি ।

(ঘ) অধিকাংশ ক্ষেত্রে একটি ভূমিরূপ গঠনে একাধিক শক্তি একত্রে সক্রিয় থাকে ।

২। নদীর অবরোহণ বা ক্ষয় প্রক্রিয়ার প্রভাবগুলি উল্লেখ করো।

উত্তর: অবরোহণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভূমির উচ্চতা হ্রাস পায়। এর প্রধান প্রভাবগুলি হলো:

(ক) এই প্রক্রিয়ার ফলে ভূ-পৃষ্ঠে নানা ধরণের ক্ষয়জাত ভূমিরূপের সৃষ্টি হয়।

(খ) পাহাড়ের ক্ষয়িষ্ণু ঢাল ক্রমশ পিছনদিকে সরে যায়, ভূতাত্ত্বিক ভাষায় একে ঢালের পশ্চাৎ-অপসারণ বলে।

(গ)অবরোহণ প্রক্রিয়ার প্রভাবে ভূমিরূপে উত্তল এবং অবতল ঢালের সৃষ্টি হয়।

৩। নদীর জলচক্র বলতে কী বোঝ? এটি কয়টি পর্যায়ে ঘটে?

উত্তর: নদী বা সাগর থেকে জল বাষ্পীভূত হয়ে ঊর্ধ্বাকাশে যায় ও ঘনীভবন প্রক্রিয়ায় মেঘ সৃষ্টি হয়। মেঘ থেকে বৃষ্টির জল ভূ-পৃষ্ঠের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পুনরায় সাগরে মিলিত হওয়ার এই চক্রাকার আবর্তনকেই জলচক্র বলে । একটি নির্দিষ্ট নদী অববাহিকা অঞ্চলে যে জলচক্র সক্রিয় থাকে তাকে নদীর জলচক্র বলে । জলচক্র প্রধানত চারটি পর্যায়ে ঘটে। যথা- ১) বাষ্পীভবন, ২) ঘনীভবন, ৩) অধঃক্ষেপণ এবং ৪) পৃষ্ঠপ্রবাহ ।

৪। মোহনায় ব-দ্বীপ গঠনের অনুকূল পরিবেশগুলি কী কী?

উত্তর: মোহনায় ব-দ্বীপ গঠনের জন্য কিছু অনুকূল প্রাকৃতিক পরিবেশের প্রয়োজন, সেগুলি হলো:

(ক) মোহনায় নদীর ঢাল অত্যন্ত মৃদু হতে হবে যাতে স্রোতের বেগ কমে যায় ।

(খ) সমুদ্র জলে লবণতার আধিক্য থাকতে হবে, যার ফলে দ্রুতহারে পলি অধঃক্ষিপ্ত হতে পারে ।

(গ) নদীর মধ্য ও নিম্নগতির দৈর্ঘ্য বেশি হতে হবে এবং নদী অববাহিকায় ক্ষয় বেশি হতে হবে, যাতে বাহিত পলির পরিমাণ বৃদ্ধি পায় ।

(ঘ) মোহনায় জোয়ার-ভাঁটার তীব্রতা কম হতে হবে, যাতে সঞ্চিত পলি ধুয়ে না যায় ।

৫। মরুকরণ প্রতিরোধের উপায়গুলি কী কী?

উত্তর: ভূমির মরুভূমিতে রূপান্তর বা মরুকরণ প্রতিরোধের প্রধান উপায়গুলি হলো:

(ক) মরুভূমির প্রান্তভাগে বনসৃজন করে বালির অগ্রসর হওয়া রোধ করতে হবে ।

(খ) মরু পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে যথেচ্ছ বৃক্ষছেদন নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন ।

(গ) জালি ও জাঙ্গল উদ্ভিদের সাহায্যে অসংবদ্ধ বালিকে সুস্থিত করতে হবে এবং যথেচ্ছ পশুচারণ বন্ধ করা প্রয়োজন ।

(ঘ) সাধারণ মানুষের মধ্যে মরুকরণ বিষয়ে জনচেতনা গড়ে তোলা উচিৎ ।

দশম শ্রেণীর ভূগোল প্রথম অধ্যায় – গুরুত্বপূর্ণ বড় প্রশ্ন ও উত্তর

১। আদর্শ নদী কাকে বলে? একটি নদীর বিভিন্ন গতিপথের বৈশিষ্ট্যগুলি সংক্ষেপে আলোচনা করো।

উত্তর: যে নদীর প্রবাহে উচ্চগতি, মধ্যগতি ও নিম্নগতি—এই তিনটি গতিই স্পষ্টভাবে দেখা যায় তাকে আদর্শ নদী বলে, যেমন গঙ্গা নদী । গঙ্গার মতো একটি আদর্শ নদীর তিনটি গতিপথের বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো:

উচ্চগতি: নদীর উৎস থেকে পার্বত্য অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত গতিপথকে উচ্চগতি বলে (গঙ্গার ক্ষেত্রে গোমুখ থেকে হরিদ্বার পর্যন্ত) । এই প্রবাহে নদীর প্রধান কাজ হলো ক্ষয়। এখানে নদী উপত্যকা সংকীর্ণ, কিন্তু পার্শ্বদেশ খাড়া ও ইংরাজি ‘V’ আকৃতির হয় এবং গভীর গিরিখাত ও জলপ্রপাত সৃষ্টি হয় ।

মধ্যগতি: পর্বতের পাদদেশ থেকে সমভূমির উপর দিয়ে প্রবাহিত গতিপথকে মধ্যগতি বলে । এই গতিপথে ক্ষয় ও বহন কার্য উভয়ই সক্রিয় থাকে । নদী উপত্যকা ক্রমশ প্রশস্ত হয় এবং মিয়েণ্ডার ও অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদের সৃষ্টি হয় ।

নিম্নগতি বা বদ্বীপ প্রবাহ: সমভূমি ছাড়িয়ে মোহনার নিকটবর্তী গতিপথ হলো নিম্নগতি । এই অংশে ভূমির ঢাল অত্যন্ত কম থাকায় নদীর প্রধান কাজ হলো সঞ্চয়কার্য । ফলে এই প্রবাহে চর এবং বদ্বীপ গড়ে ওঠে ।

২। হিমবাহের ক্ষয়কার্যের ফলে সৃষ্ট তিনটি প্রধান ভূমিরূপের বিস্তারিত বিবরণ দাও।

উত্তর: হিমবাহ প্রধানত অবঘর্ষ ও উৎপাটন প্রক্রিয়ায় ক্ষয়কার্য করে থাকে । হিমবাহের ক্ষয়কার্যের ফলে সৃষ্ট তিনটি প্রধান ভূমিরূপ হলো:

সার্ক বা করি: উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে হিমবাহের ক্ষয়কার্যের ফলে পাহাড়ের খাঁজে উৎপন্ন অর্ধগোলাকৃতি বা ডেকচেয়ারের মতো গহ্বরকে সার্ক বলে । সার্কের মধ্যাংশের খাদটিতে অনেকসময় হিমবাহ গলে গিয়ে যে হ্রদের সৃষ্টি হয় তাকে করি হ্রদ বলে । এটি স্কটল্যান্ডে করি নামে পরিচিত ।

হিমদ্রোণী (‘U’ আকৃতির উপত্যকা): হিমবাহ যে পার্বত্য উপত্যকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়, সেখানে ক্রমাগত অবঘর্ষ ও উৎপাটন প্রক্রিয়ায় ক্ষয়কার্যের ফলে উপত্যকাটি প্রশস্ত ও গভীর হয়ে ইংরেজি ‘U’ আকার ধারণ করে। একে ‘U’-আকৃতির উপত্যকা বা হিমদ্রোণী বলে ।

ঝুলন্ত উপত্যকা: পার্বত্য অঞ্চলে প্রধান হিমবাহের উপত্যকা অনেক গভীর হয় এবং ছোট ছোট উপহিমবাহের উপত্যকা অগভীর হয় । প্রধান ও উপহিমবাহের মিলনস্থলে উপহিমবাহের অগভীর উপত্যকা যেন প্রধান হিমবাহের গভীর উপত্যকার উপর ঝুলন্ত অবস্থায় আছে বলে মনে হয়। একে ঝুলন্ত উপত্যকা বলে (যথা- বদ্রীনাথের কাছে ঋষিগঙ্গা) ।

৩। বায়ুর ক্ষয়কার্যের ফলে সৃষ্ট প্রধান ভূমিরূপগুলি সম্পর্কে আলোচনা করো।

উত্তর: বায়ু মরুভূমিতে অবঘর্ষ, ঘর্ষণ ও অপসারণ প্রক্রিয়ায় প্রবলভাবে ক্ষয়কার্য করে । এর ফলে সৃষ্ট প্রধান ভূমিরূপগুলি হলো:

গৌর বা গারা: মরুভূমিতে কঠিন ও কোমল শিলাস্তর পর্যায়ক্রমে অনুভূমিকভাবে অবস্থান করলে অবঘর্ষ ক্ষয়ের ফলে কোমল শিলা দ্রুত ক্ষয় পায় । কিন্তু উপরের কঠিন শিলা ক্ষয় প্রতিরোেধ করে চ্যাপ্টা আকৃতির হয় এবং নীচের অংশ সরু পিলারের আকার নেয়। তখন ওই ভূমিরূপকে ব্যাঙের ছাতার ন্যায় দেখায়, একে গৌর বলে ।

জিউগেন: মরু অঞ্চলে কোমল ও কঠিন শিলা পরস্পর অনুভূমিকভাবে অবস্থান করলে বায়ুপ্রবাহে কোমল শিলা দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে খাতের সৃষ্টি করে এবং কঠিন শিলা কম ক্ষয়ে সমতল চূড়া বিশিষ্ট ভূমিরূপ তৈরি করে। খাত ও চূড়াবিশিষ্ট এই ভূমিরূপকে জিউগেন বলে ।

ইয়ারদাং: মরু অঞ্চলে কঠিন ও কোমল শিলা পর্যায়ক্রমে উল্লম্বভাবে অবস্থান করলে বায়ু শিলার সমান্তরালে প্রবাহিত হয় । এর ফলে কোমল শিলা ক্ষয়ে লম্বা পরিখার আকার ধারণ করে এবং কঠিন শিলা প্রাচীরের ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকে। এরূপ ভূমিরূপকে ইয়ারদাং বলে ।

৪। নদীর সঞ্চয়কার্যের ফলে সৃষ্ট তিনটি ভূমিরূপের বিবরণ দাও।

উত্তর: নদীর নিম্নগতিতে ও সমভূমি প্রবাহে স্রোতের বেগ কমে যাওয়ায় নদীবাহিত পলি, নুড়ি, বালি প্রভৃতি সঞ্চিত হতে থাকে । নদীর সঞ্চয়কার্যের ফলে সৃষ্ট উল্লেখযোগ্য ভূমিরূপগুলি হলো:

পলল ব্যজনী: পার্বত্য অঞ্চল থেকে নদী সমভূমিতে প্রবেশ করলে ভূমির ঢাল হঠাৎ খুব কমে যাওয়ায় নদীর বহন ক্ষমতা থাকে না । ফলে পর্বতের পাদদেশে নুড়ি, পলি সঞ্চিত হয়ে শঙ্কু আকৃতির ভূমিরূপ সৃষ্টি করে যাকে পলল শঙ্কু বলে । এই পলল শঙ্কুর উপর দিয়ে নদী বিভিন্ন খাতে প্রবাহিত হলে তা অর্ধগোলাকার রূপ নেয়, একে পলল ব্যজনী বলে ।

প্লাবন সমভূমি: বর্ষাকালে বন্যার জল নদীর স্বাভাবিক বাঁধ অতিক্রম করে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত করে । বন্যার জল অপসারিত হলে প্লাবিত অঞ্চলে নদীবাহিত পলি জমা হয়ে যে উর্বর সমভূমির সৃষ্টি হয়, তাকে প্লাবন সমভূমি বলে ।

ব-দ্বীপ: নিম্নগতির শেষ পর্যায়ে নদী মোহনার কাছে পৌঁছে একাধিক শাখায় বিভক্ত হয়ে পড়ে । সেখানে নদীবাহিত পলি সঞ্চিত হয়ে যে সমভূমি সৃষ্টি হয় তা দেখতে অনেকটা মাত্রাহীন বাংলা ‘ব’-অক্ষরের মতো হয় বলে একে ব-দ্বীপ বা ব-দ্বীপ সমভূমি বলে ।

৫। হিমবাহের সঞ্চয়কার্যের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপগুলি সংক্ষেপে আলোচনা করো।

উত্তর: হিমবাহ পার্বত্য প্রবাহে ও পাদদেশে বাহিত পদার্থ সঞ্চয় করে নানা বৈচিত্র্যময় ভূমিরূপ সৃষ্টি করে, যথা:

গ্রাবরেখা: পার্বত্য প্রবাহে হিমবাহের সঙ্গে বাহিত বিভিন্ন পদার্থ (শিলাখণ্ড, নুড়ি) উপত্যকার বিভিন্ন অংশে সঞ্চিত হলে তাকে গ্রাবরেখা বলে । অবস্থান অনুসারে এটি পার্শ্ব গ্রাবরেখা, মধ্য গ্রাবরেখা ও প্রান্ত গ্রাবরেখায় বিভক্ত ।

ড্রামলিন: হিমবাহ বাহিত শিলাখণ্ড, বালি, কাদা প্রভৃতি সঞ্চিত হয়ে সমভূমির সৃষ্টি করে । এরূপ সমভূমির আকৃতি উলটানো নৌকা বা উলটানো চামচের মতো দেখতে হলে তাকে ড্রামলিন বলে ।

বহিঃধৌত সমভূমি: হিমবাহের প্রবাহপথের শেষে প্রান্ত গ্রাবরেখায় সঞ্চিত পদার্থসমূহ বরফগলা জল ও নদীর সাহায্যে সম্মুখদিকে কিছুটা দূরে বাহিত হয়ে পুনরায় সঞ্চিত হয়ে যে সমভূমির সৃষ্টি হয় তাকে বহিঃধৌত সমভূমি বলে ।

এসকার: পর্বতের পাদদেশ অঞ্চলে হিমবাহের বয়ে আনা শিলাখণ্ড, নুড়ি, কাদা প্রভৃতি সঞ্চিত হয়ে যে আঁকাবাঁকা শৈলশিরা বা বাঁধের ন্যায় ভূমিরূপ সৃষ্টি করে তাকে এসকার বলে ।