বাংলার উৎসব: ধর্মীয়, ঋতুভিত্তিক ও সামাজিক উৎসব নিয়ে প্রবন্ধ রচনা

Arindam Saha

Published On:

আজকে তোমাদের পরীক্ষার জন্য “বাংলার উৎসব” রচনা তুলে ধরা হল, যা মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও অন্যান্য শ্রেণির পরীক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই রচনাটি বাংলার সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবন, ঐতিহ্য ও আনন্দমুখর উৎসবগুলিকে সহজ ভাষায় তুলে ধরেছে, যাতে পরীক্ষায় উত্তর লেখার সময় বিষয়টি স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা যায়। অতএব তোমরা এখান থেকে রচনাটি মনোযোগ দিয়ে পড়ে নিতে পারো অথবা পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য সংগ্রহ করে রাখতে পারো।

প্রবন্ধ রচনা: বাংলার উৎসব

প্রবাদ আছে— “বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ।” বাঙালির জীবন ও উৎসব যেন একই সুতোয় গাঁথা। আদিম কাল থেকেই বাঙালি জাতি উৎসবপ্রিয়। প্রাচীন বাংলার সমাজজীবন ছিল গ্রামকেন্দ্রিক, আর সেই গ্রামীণ জীবনের সুখ-দুঃখ, ধর্মবোধ ও অর্থনৈতিক কামনাবাসনা থেকেই উৎসবের জন্ম। একঘেয়ে দৈনন্দিন জীবনের ক্লান্তি দূর করতে এবং মনের আনন্দকে সবার মধ্যে ভাগ করে নিতে উৎসবের কোনো বিকল্প নেই। ধনী-দরিদ্র, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে মানুষ যখন এক প্রাঙ্গণে মিলিত হয়, তখনই তা সার্থক উৎসবে পরিণত হয়।

উৎসবের শ্রেণিবিভাগ

বাংলার উৎসবগুলিকে চরিত্র অনুযায়ী কয়েকটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন—ধর্মীয় উৎসব, ঋতুভিত্তিক উৎসব, সামাজিক উৎসব এবং লৌকিক ব্রত-পার্বণ। প্রতিটি উৎসবেরই মূল সুর হলো মিলন ও আনন্দ।

Read More:  বিশ্ব উষ্ণায়ন প্রবন্ধ রচনা Class 12 | প্রবন্ধ রচনা: বিশ্বায়ন

শারদীয়া ও অন্যান্য ধর্মীয় উৎসব

বাঙালির উৎসবের ক্যালেন্ডারে ধর্মীয় উৎসবই প্রধান স্থান দখল করে আছে।

  • শারদীয়া দুর্গাপূজা: বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব হলো শারদীয়া দুর্গাপূজা। শোনা যায়, যজ্ঞের বিকল্প হিসেবে পঞ্চদশ বা ষোড়শ শতকে উত্তরবঙ্গের তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণ এই পূজার প্রবর্তন করেছিলেন। শরতের নীল আকাশ আর ঢাকের আওয়াজে ধনী-দরিদ্র সবাই ভেদাভেদ ভুলে আনন্দে মেতে ওঠে। মা দুর্গা এখানে কেবল দেবী নন, তিনি ঘরের মেয়ে—শক্তির রূপক।
  • লক্ষ্মীপূজা ও কালীপূজা: দুর্গাপূজার পরেই আসে কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা। এই দিনে বাংলার মা-বোনেদের হাতে আঁকা আলপনা আমাদের লোকশিল্পের পরিচয় দেয়। এরপর অমাবস্যার রাতে আসে কালীপূজা বা দীপাবলি। এই আলো কেবল বাইরের অন্ধকার দূর করে না, মনের অজ্ঞানতা ও কুসংস্কার দূর করে প্রজ্ঞার আলো জ্বালাতেও সাহায্য করে।
  • অন্যান্য পূজা: কার্তিক মাসে সন্তানকামনায় কার্তিক পূজা, বসন্তে রঙের উৎসব দোলযাত্রা, বর্ষায় রথযাত্রা, ভাদ্রমাসে বিশ্বকর্মা পূজা এবং হেমন্তে জগদ্ধাত্রী পূজা বাঙালির ধর্মীয় আবেগের বহিঃপ্রকাশ।

ঋতুভিত্তিক ও লৌকিক ব্রত উৎসব

বাংলার উৎসবের সঙ্গে প্রকৃতির নিবিড় যোগ রয়েছে। গ্রামবাংলার মেয়েরা সংসারের মঙ্গলকামনায় সারাবছর ধরে নানা ব্রত পালন করেন। পুণ্যিপুকুর, ইতুপূজা, সেঁজুতি ব্রত, বসুধারা ব্রত, মাঘমন্ডল ব্রত—এগুলি বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতি। এছাড়া কৃষিজীবী মানুষ নতুন ধান ওঠার আনন্দে পালন করে নবান্ন উৎসব এবং পৌষ সংক্রান্তির পিঠেপুলি উৎসব বা পৌষপার্বণ।

সর্বধর্মের মিলনক্ষেত্র

উৎসবের কোনো ধর্ম হয় না, উৎসব সবার। বাঙালি হিন্দু যেমন দুর্গাপূজায় মাতে, তেমনই মুসলিম ভাই-বোনেদের ঈদ-উল-ফিতর ও মহরম এবং খ্রিস্টানদের বড়দিন বা ক্রিসমাস বাংলার উৎসবের আঙিনাকে আরও প্রশস্ত করেছে। বৌদ্ধদের বুদ্ধপূর্ণিমা বা জৈনদের পরেশনাথ উৎসবও সমান শ্রদ্ধায় পালিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন— “প্রতিদিন মানুষ ক্ষুদ্র, দীন, একাকী। কিন্তু উৎসবের দিনে মানুষ বৃহৎ।” এই উৎসবের দিনগুলিতেই বাঙালি সংকীর্ণতা ভুলে মৈত্রী ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়।

Read More:  আমার জীবনের লক্ষ্য: আদর্শ কৃষক হওয়া (প্রবন্ধ রচনা)

জাতীয় উৎসব

দেশপ্রেমের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বাঙালি পালন করে স্বাধীনতা দিবস (১৫ই আগস্ট) এবং প্রজাতন্ত্র দিবস (২৬শে জানুয়ারি)। এছাড়া রবীন্দ্রজয়ন্তী, নজরুল জয়ন্তী এবং নেতাজির জন্মদিন পালনের মধ্য দিয়ে বাঙালি নিজের সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে।

সেকাল ও একালের উৎসব (পরিবর্তন):

সময়ের সাথে সাথে উৎসবের রূপ বদলেছে। আগে উৎসব ছিল গ্রামকেন্দ্রিক এবং পারিবারিক। ধনীর চণ্ডীমণ্ডপে পূজা হতো, কিন্তু সেখানে গ্রামের সব মানুষের অবারিত দ্বার ছিল। উৎসবের খরচ ও দায়িত্ব সবাই মিলে ভাগ করে নিত। সেখানে আড়ম্বর কম ছিল, কিন্তু আন্তরিকতা ছিল প্রচুর।

আধুনিক যুগে মানুষের ব্যস্ততা বেড়েছে। উৎসব এখন অনেক ক্ষেত্রে ‘ইভেন্ট’ বা লোকদেখানো অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। পারিবারিক পূজার জায়গা নিয়েছে ‘সার্বজনীন’ বা ‘ক্লাবের পূজা’। অনেক ক্ষেত্রে ভক্তি ও শ্রদ্ধার চেয়ে মাইকের আওয়াজ, ডিজে-র উৎপাত এবং আলোকসজ্জার প্রতিযোগিতা বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

উৎসবের সামাজিক দায়বদ্ধতা ও অবক্ষয়

বর্তমানে উৎসবের নামে কিছু অনভিপ্রেত ঘটনাও ঘটছে। জোর করে চাঁদা আদায়, অতিরিক্ত শব্দদূষণ এবং অপসংস্কৃতি উৎসবের পবিত্রতাকে নষ্ট করছে। বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর যথার্থই বলেছিলেন— “আমার আনন্দে সকলের আনন্দ হউক… এই কল্যাণ ইচ্ছাই উৎসবের প্রাণ।” কিন্তু এখন অনেকেই নিজের আনন্দ করতে গিয়ে অন্যের কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ান। উৎসবের বিপুল অর্থ বাজি বা আলোকসজ্জায় অপচয় না করে যদি দুঃস্থ মানুষের সেবায়, রক্তদান শিবিরে বা স্বাস্থ্য পরীক্ষায় ব্যয় করা হয়, তবেই উৎসব সার্থক হয়ে উঠবে।

উৎসবের প্রয়োজনীয়তা ও মিলনমেলা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন— “প্রতিদিন মানুষ ক্ষুদ্র, দীন, একাকী। কিন্তু উৎসবের দিনে মানুষ বৃহৎ।” সত্যিই তাই। উৎসবের দিন মানুষ তার ভেদাভেদ ভুলে যায়। ধনী-দরিদ্র, উচ্চ-নীচ, হিন্দু-মুসলমান—সবাই এক পংক্তিতে এসে দাঁড়ায়। কর্মব্যস্ত জীবনে উৎসব আমাদের নতুন করে বাঁচার অক্সিজেন যোগায়। এটি কেবল আনন্দ নয়, মানুষে মানুষে মিলনের এক মহাতীর্থক্ষেত্র।

Read More:  সত্যজিৎ রায় জীবনী রচনা – Satyajit Ray Biography in Bengali

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, উৎসব হলো জাতির প্রাণশক্তি। আধুনিকতার ছোঁয়ায় উৎসবের আঙ্গিক বদলালেও এর অন্তরের সুরটি যেন হারিয়ে না যায়, সেদিকে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। উৎসব মানে কেবল ছুটি কাটানো নয়, উৎসব মানে মানুষে মানুষে মিলনের সেতু তৈরি করা। সমাজকে আলোকিত করা এবং গরিব-দুঃখীর মুখে হাসি ফোটানোই হোক বাংলার উৎসবের আসল উদ্দেশ্য। সমস্ত কালিমা মুছে ‘আনন্দললোকে মঙ্গলালোকে’ বিরাজ করাই হোক আমাদের প্রার্থনা।

শিক্ষা সংক্রান্ত আপডেট, সরকারি ও বেসরকারি চাকরির খবর, পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি এবং প্রয়োজনীয় স্টাডি মেটিরিয়াল—সবকিছু এক জায়গায়, নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্যভাবে পেতে আমাদের ওয়েবসাইট karmasangsthan24.in নিয়মিত ফলো করুন। তা ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ নোটিস ও দ্রুত আপডেট মিস না করতে আমাদের WhatsApp ও Telegram গ্রুপে যুক্ত থাকুন।

Leave a Comment