বেগম রোকেয়া – জীবনী রচনা | Begum Rokeya Jiboni

Arindam Saha

Published On:

আজকে তোমাদের পরীক্ষার জন্য বেগম রোকেয়া – জীবনী রচনা তুলে ধরা হল, যা মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বিশেষভাবে সহায়ক হবে। নারীশিক্ষা, সমাজসংস্কার ও মানবমুক্তির প্রশ্নে যাঁর অবদান বাংলা সাহিত্য ও সমাজজীবনে চিরস্মরণীয়, সেই বেগম রোকেয়া-র জীবন ও কর্ম এই রচনার মাধ্যমে সহজ ও সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরা হয়েছে। পরীক্ষায় উপযোগী ভাষা ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের সমন্বয়ে তৈরি এই জীবনী রচনাটি তোমরা মনোযোগ দিয়ে পড়লে উত্তর লেখার ক্ষেত্রে স্পষ্ট ধারণা পাবে।

প্রবন্ধ রচনা: বেগম রোকেয়া

অন্ধকার রাতে যেমন ধ্রুবতারা পথ দেখায়, ঠিক তেমনই বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে অবিভক্ত বাংলার রক্ষণশীল সমাজে নারীদের আলোর দিশারী হয়ে এসেছিলেন বেগম রোকেয়া। তিনি কেবল দক্ষিণ এশিয়ার নারীমুক্তি আন্দোলনের পথিকৃৎ ছিলেন না; তিনি একাধারে ছিলেন একজন বলিষ্ঠ সাহিত্যিক, শিক্ষাব্রতী, সমাজসংস্কারক এবং নারীবাদী চিন্তাবিদ। পুরুষশাসিত সমাজে নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।

জন্ম ও বংশপরিচয়

১৮৮০ খ্রিস্টাব্দের ৯ই ডিসেম্বর, তৎকালীন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত রংপুর জেলার পায়রাবন্দ গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত ও অভিজাত মুসলিম ভূস্বামী পরিবারে রোকেয়া খাতুন জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা জহিরুদ্দিন মুহম্মদ আবু আলি হায়দার সাবের ছিলেন একজন বহুভাষী বুদ্ধিজীবী ও জমিদার। মাতা ছিলেন রাহাতুন্নেসা সাবেরা চৌধুরানী। তৎকালীন মুসলিম সমাজ ছিল অত্যন্ত রক্ষণশীল, যেখানে মেয়েদের বাড়ির বাইরে যাওয়া বা লেখাপড়া শেখা ছিল নিষিদ্ধ। দুই বোন ও তিন ভাইয়ের মধ্যে বড় ভাই ইব্রাহিম সাবের এবং বড় বোন করিমুন্নেসা খানম চৌধুরানী রোকেয়ার জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিলেন।

Read More:  বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচনা ও জীবনকথা: সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধ রচনা (সহজ ভাষায়)

শৈশব ও দুর্গম শিক্ষালাভ

রোকেয়ার শৈশব কেটেছে কঠোর পর্দা প্রথার আড়ালে। কিন্তু তাঁর ছিল অদম্য জ্ঞানপিপাসা। সেই যুগে অভিজাত মুসলিম পরিবারে কেবল আরবি ও উর্দু শেখার চল ছিল, বাংলা বা ইংরেজি শেখা ছিল বারণ। কিন্তু রোকেয়া দমে যাননি। ভাই ইব্রাহিম সাবেরের উৎসাহে এবং গোপন সহযোগিতায় তিনি গভীর রাতে মোমবাতির আলোয় বাংলা ও ইংরেজি ভাষা আয়ত্ত করেন। বড় বোন করিমুন্নেসার কাছে তিনি সাহিত্যের প্রথম পাঠ নেন। সমাজের ভ্রুকুটিকে উপেক্ষা করে তিনি নিজেকে একজন বিদুষী নারী হিসেবে গড়ে তোলেন।

বিবাহ ও কর্মজীবনের সূচনা

১৮৯৮ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে বিহারের ভাগলপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট খান বাহাদুর সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। স্বামী সাখাওয়াত হোসেন ছিলেন অত্যন্ত উদারমনা ও আধুনিক চিন্তাধারার মানুষ। তিনি রোকেয়াকে বাংলা ও ইংরেজি চর্চা চালিয়ে যেতে এবং সাহিত্য রচনায় উৎসাহিত করেন। স্বামীর পরামর্শেই রোকেয়া বাংলা ভাষাকে তাঁর সাহিত্যচর্চার মূল মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন। ১৯০২ সালে ‘পিপাসা’ নামক একটি রচনার মধ্য দিয়ে তাঁর সাহিত্যিক জীবনের আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে।

শিক্ষা বিস্তারে অসামান্য অবদান

বেগম রোকেয়া বিশ্বাস করতেন, “শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড এবং নারীরা জাতির অর্ধাংশ। তাই নারীদের বাদ দিয়ে জাতির উন্নতি অসম্ভব।” ১৯০৯ সালে স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি স্বামীর দেওয়া অর্থে ভাগলপুরে মাত্র ৫ জন ছাত্রী নিয়ে ‘সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু পারিবারিক ও সামাজিক বাধার কারণে তিনি ১৯১১ সালের ১৬ই মার্চ স্কুলটি কলকাতায় (১৩ নং ওয়ালিউল্লাহ লেন) স্থানান্তরিত করেন। শুরুতে ছাত্রী সংখ্যা ছিল মাত্র ৮ জন। তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের বুঝিয়ে মেয়েদের স্কুলে আনতেন। তাঁর প্রায় দুই দশকের অক্লান্ত পরিশ্রমে এই স্কুলটি একটি উচ্চ ইংরেজি বালিকা বিদ্যালয়ে পরিণত হয় এবং মুসলিম মেয়েদের শিক্ষার আদর্শ স্থান হয়ে ওঠে।

Read More:  শতবর্ষে নারায়ণ দেবনাথ প্রবন্ধ রচনা | নারায়ন দেবনাথ এর জীবনী রচনা

সাহিত্যিক জীবন ও সমাজসংস্কার

বেগম রোকেয়া তাঁর ক্ষুরধার লেখনীকে সমাজ সংস্কারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। তাঁর রচনায় সামাজিক কুসংস্কার, অবরোধ প্রথা এবং নারীর প্রতি অন্যায়ের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ফুটে উঠেছে।

  • মতিচূর (১ম ও ২য় খণ্ড): এটি তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ সংকলন। এখানে ‘সৌরজগৎ’, ‘জ্ঞান-ফল’, ‘নারী-সৃষ্টি’র মতো রচনা স্থান পেয়েছে।
  • সুলতানার স্বপ্ন (Sultana’s Dream): ১৯০৫ সালে রচিত এই নারীবাদী ইউটোপিয়ান উপন্যাসিকায় তিনি এক ‘নারীস্তান’ বা ‘Ladyland’-এর কল্পনা করেছেন, যা বিশ্বসাহিত্যে বিরল।
  • অবরোধবাসিনী: এই গ্রন্থে তিনি হাস্যরস ও ব্যঙ্গের মাধ্যমে পর্দা প্রথার নির্মম রূপ তুলে ধরেছেন।
  • অন্যান্য রচনা: তাঁর লেখা উপন্যাস ‘পদ্মরাগ’ এবং বিভিন্ন গল্প, কবিতা ও প্রবন্ধ তৎকালীন ‘নবনূর’, ‘সওগাত’, ‘মোহাম্মদী’ প্রভৃতি বিখ্যাত পত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশিত হতো। উর্দুর প্রচলন বেশি থাকা সত্ত্বেও তিনি বাংলা ভাষায় সাহিত্যচর্চা করে মাতৃভাষার প্রতি গভীর মমত্ববোধের পরিচয় দেন।

নারীবাদী আদর্শ ও সংগঠন

বেগম রোকেয়া বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহের ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি ১৯১৬ সালে ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম’ (Muslim Women’s Association) নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। এই সমিতির মাধ্যমে তিনি দুস্থ ও অসহায় নারীদের কর্মসংস্থান ও শিক্ষার ব্যবস্থা করতেন। তিনি নারীদের বুঝিয়েছিলেন যে, শুধুমাত্র গয়না বা শাড়ি নয়, শিক্ষার অলঙ্কারই নারীর প্রকৃত সৌন্দর্য।

জীবনাবসান

নারী জাগরণের এই আলোকবর্তিকা ১৯৩২ সালের ৯ই ডিসেম্বর, নিজের ৫২তম জন্মদিনে কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি চলে গেলেও রেখে গেছেন তাঁর অবিনাশী আদর্শ।

উপসংহার

বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন কেবল একটি নাম নয়, একটি ইতিহাস। আজ যে নারীরা দেশ ও দশের নেতৃত্ব দিচ্ছে, তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে গিয়েছিলেন এই মহীয়সী নারী। তিনি আমাদের শিখিয়েছিলেন, নারীরা কেবল ‘অবরোধবাসিনী’ নয়, তাঁরাও মানুষ এবং সমাজের সমান অংশীদার। তাঁর দেখানো পথেই আজ নারীসমাজ কুসংস্কারের অন্ধকার থেকে আলোর পথে এগিয়ে চলেছে। যতদিন বাংলা ভাষা ও নারীশিক্ষার কথা আলোচিত হবে, ততদিন বেগম রোকেয়া আমাদের হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবেন।

শিক্ষা সংক্রান্ত আপডেট, সরকারি ও বেসরকারি চাকরির খবর, পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি এবং প্রয়োজনীয় স্টাডি মেটিরিয়াল—সবকিছু এক জায়গায়, নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্যভাবে পেতে আমাদের ওয়েবসাইট karmasangsthan24.in নিয়মিত ফলো করুন। তা ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ নোটিস ও দ্রুত আপডেট মিস না করতে আমাদের WhatsApp ও Telegram গ্রুপে যুক্ত থাকুন।

Leave a Comment