আজকে তোমাদের পরীক্ষার জন্য বিশ্বায়ন বিষয়ক একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ তুলে ধরা হলো, যা তোমাদের পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বিশেষভাবে সহায়তা করবে। বর্তমান যুগে বিশ্বায়ন একটি বহুল আলোচিত ও প্রাসঙ্গিক বিষয় হওয়ায় পরীক্ষায় এই প্রবন্ধটি বারবার আসার সম্ভাবনা থাকে। তাই ছাত্রছাত্রীদের সুবিধার্থে সহজ ও বোধগম্য ভাষায় প্রবন্ধটি এখানে উপস্থাপন করা হলো। তোমরা চাইলে এখান থেকে এটি পড়ে নিতে পারো অথবা সংগ্রহ করে রাখতে পারো।
প্রবন্ধ রচনা: বিশ্বায়ন
বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত এবং প্রভাবশালী শব্দটি হলো ‘বিশ্বায়ন’ বা ‘Globalization’। ইংরেজি ‘Globe’ শব্দ থেকে এর উৎপত্তি। শাব্দিক অর্থে বিশ্বায়ন বলতে বোঝায় সমগ্র বিশ্বকে একটি অখণ্ড সত্তা হিসেবে গড়ে তোলা। এটি এমন একটি বহুমুখী প্রক্রিয়া, যা জাতি-রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমানা মুছে দিয়ে সমগ্র পৃথিবীকে মানুষের হাতের মুঠোয় এনে এক ‘বিশ্বগ্রাম’ বা ‘Global Village’-এ পরিণত করেছে। প্রকৃতপক্ষে,
"Globalization is a process of development of the world into a single interested economic unit." যদিও প্রাথমিকভাবে এটি একটি অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া হিসেবে শুরু হয়েছিল, কিন্তু আজ সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও এর প্রভাব সুগভীর।
বিশ্বায়নের ধারণা ও প্রেক্ষাপট:
বিশ্বায়ন কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, এটি মানবসভ্যতার ক্রমবিবর্তনের ফল। মার্শাল ম্যাকলুহান প্রথম ‘গ্লোবাল ভিলেজ’-এর ধারণা দেন। এর মূল মন্ত্র হলো অবাধ বাণিজ্য, পুঁজির মুক্ত প্রবাহ এবং প্রযুক্তির আদান-প্রদান। স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর নব্বইয়ের দশক থেকে বিশ্বায়নের জয়যাত্রা শুরু হয়। এর ফলে পৃথিবী আজ আর খণ্ড খণ্ড দ্বীপ নয়, বরং এক বিশাল মহাদেশে পরিণত হয়েছে। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং ইন্টারনেট প্রযুক্তির কল্যাণে আজ আমরা মুহূর্তের মধ্যে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছি।
বিশ্বায়নের অর্থনৈতিক মাত্রা (সুযোগ ও সংকট):
বিশ্বায়নের প্রধান চালিকাশক্তি হলো অর্থনীতি। এর প্রভাবে বিশ্ব বাণিজ্যের মানচিত্র বদলে গেছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) রিপোর্ট অনুযায়ী, গত ৫০ বছরে বিশ্ব বাণিজ্য প্রায় ১০০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বহুজাতিক সংস্থাগুলো (MNC) আজ শ্রমের মূল্য কমানোর লক্ষ্যে তাদের কারখানা উন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে (যেমন—চীন, ভারত, বাংলাদেশ) স্থানান্তর করছে। এর ফলে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান বাড়ছে, অন্যদিকে সস্তা শ্রমের শোষণও চলছে।
বাজার অর্থনীতি: বিশ্বায়নের ফলে মানুষ এখন ঘরে বসেই বিশ্বের সেরা পণ্যটি ব্যবহার করতে পারছে। তবে এর নেতিবাচক দিক হলো, বড় মাছ যেমন ছোট মাছকে খেয়ে ফেলে, তেমনি বহুজাতিক কোম্পানির দাপটে ছোট ও কুটির শিল্পগুলো ধ্বংসের মুখে পড়ছে। আইএমএফ (IMF) ও বিশ্বব্যাংকের মতো সংস্থাগুলো অনেক সময় ঋণের জালে জড়িয়ে গরিব দেশগুলোর নীতি নির্ধারণে হস্তক্ষেপ করছে।
রাজনৈতিক মাত্রা ও ক্ষমতার মেরুকরণ:
বিশ্বায়ন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও আমূল পরিবর্তন এনেছে। স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব রাজনীতির মোড়ল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশ্বায়নের সুযোগ নিয়ে শক্তিশালী দেশগুলো দুর্বল দেশগুলোর ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করছে। ইরাক বা আফগানিস্তানে মার্কিন আগ্রাসন এর জ্বলন্ত প্রমাণ।
তবে ইতিবাচক দিক হলো, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU), আসিয়ান (ASEAN)-এর মতো জোটগুলো গঠিত হয়েছে। কোথাও প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে বিশ্ববাসী সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আজ বিশ্ব জনমত গড়ে উঠছে।
বিশ্বায়ন ও সংস্কৃতি:
বিশ্বায়নের ফলে সংস্কৃতির আদান-প্রদান বেড়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে ‘সাংস্কৃতিক আগ্রাসন’ বা ‘Cultural Imperialism’-এর ভয়ও তৈরি হয়েছে। ইংরেজির দাপটে বিশ্বের অনেক আঞ্চলিক ভাষা আজ বিলুপ্তির পথে। ২০৫০ সালের মধ্যে ইংরেজির একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আমাদের খাদ্যাভ্যাস, পোশাক-পরিচ্ছদ এবং বিনোদনে আজ পাশ্চাত্যের ছোঁয়া। যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার বাড়ছে। তরুণ প্রজন্ম ফাস্ট ফুড, পপ কালচার এবং ভ্যালেন্টাইনস ডের মতো বিদেশি সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। আমাদের নিজস্ব মূল্যবোধ ও ঐতিহ্য আজ হুমকির মুখে।
বিশ্বায়ন ও পরিবেশ:
বিশ্বায়নের ইঁদুর দৌড়ে আমরা পরিবেশকে চরমভাবে অবহেলা করছি। অবাধ শিল্পায়ন এবং জীবাশ্ম জ্বালানির অত্যধিক ব্যবহারের ফলে ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’ বা বিশ্ব উষ্ণায়ন আজ মানবজাতির অস্তিত্বের সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মেরু অঞ্চলের বরফ গলছে, সমুদ্রের জলস্তর বাড়ছে এবং ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। ধনী দেশগুলোর ভোগবাদী মানসিকতার মাশুল দিতে হচ্ছে গরিব দেশগুলোকে।
বিশ্বায়ন ও ভারত:
১৯৯১ সালে নতুন অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণের মাধ্যমে ভারতে বিশ্বায়নের সূচনা হয়। এর ফলে ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি শিল্প (IT Sector) ও আউটসোর্সিং-এ অভাবনীয় উন্নতি হয়েছে এবং প্রচুর বিদেশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। মানুষের জীবনযাত্রার মান ও আধুনিক পণ্যের ব্যবহার বেড়েছে।
তবে এর কিছু নেতিবাচক দিকও আছে। বিশ্ববাজারের প্রতিযোগিতায় ভারতের কৃষি ও ক্ষুদ্র কুটির শিল্পগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া বিদেশি সংস্কৃতির প্রভাবে আমাদের দেশীয় ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ কিছুটা হুমকির মুখে। সব মিলিয়ে, বিশ্বায়ন ভারতকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করলেও এর সুফল যাতে গরিব ও সাধারণ মানুষ পায়, সেদিকে লক্ষ্য রাখা জরুরি।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ:
বিশ্বায়ন একটি অপ্রতিরোধ্য প্রক্রিয়া। একে থামিয়ে রাখা যাবে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বিশ্বায়ন কার জন্য? বর্তমানে বিশ্বায়ন ধনীকে আরও ধনী এবং গরিবকে আরও গরিব করছে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেছেন, “মানব উন্নয়নকে বাদ দিয়ে কখনো বিশ্বায়ন সম্ভব নয়।” তাই আমাদের চ্যালেঞ্জ হলো, বিশ্বায়নকে মানবিক এবং কল্যাণমুখী করে তোলা। প্রযুক্তি ও সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে পারলেই বিশ্বায়ন সার্থক হবে।
উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, বিশ্বায়ন হলো দু’ধারি তলোয়ারের মতো। এর সুফল যেমন আছে, কুফলও কম নয়। তবে সবকিছু নির্ভর করছে আমরা কীভাবে একে গ্রহণ করছি তার ওপর। বিশ্বায়নের স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়ে নিজেদের শিকড়কে ভুলে গেলে চলবে না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, “আমরা বিশ্বকে গ্রহণ করব, কিন্তু নিজেকে বিসর্জন দিয়ে নয়।” আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত নিজস্ব সংস্কৃতি ও স্বকীয়তা বজায় রেখে বিশ্বায়নের সুফলগুলোকে কাজে লাগিয়ে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা।




