আজকের এই প্রবন্ধে তোমাদের পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নারায়ণ দেবনাথ (শতবর্ষ) – জীবনী রচনা তুলে ধরা হলো। বাংলা কমিক্স ও চিত্রসাহিত্যের ইতিহাসে নারায়ণ দেবনাথ এমন এক নাম, যিনি শিশুসাহিত্যকে শুধু আনন্দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং সমাজ, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের পাঠ সহজ ও হাস্যরসের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন।
তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলি আজ কেবল কাগজের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং বহু প্রজন্মের শৈশব ও কিশোরবেলার স্মৃতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। জন্মশতবর্ষের প্রেক্ষিতে তাঁর জীবন ও সাহিত্যকীর্তি নতুন করে আলোচনার দাবি রাখে। পরীক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে এই রচনাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায়, শিক্ষার্থীরা এখান থেকে সহজেই পড়ে নিতে বা সংগ্রহ করে রাখতে পারে।
প্রবন্ধ রচনা: শতবর্ষে কার্টুনশিল্পী নারায়ণ দেবনাথ
বাঙালি শিশুর শৈশব আর নারায়ণ দেবনাথ—এই দুটি নাম একে অপরের পরিপূরক। গত কয়েক দশক ধরে যার তুলির টানে বাঙালির ছোটবেলা রঙিন হয়েছে, তিনি হলেন নারায়ণ দেবনাথ। তিনি কেবল একজন কার্টুনিস্ট বা কমিক শিল্পী নন, তিনি বাঙালির ‘মন খারাপের ওষুধ’। ১৯২৫ সালে জন্মগ্রহণকারী এই মহান শিল্পীর আমরা এখন জন্মশতবর্ষ (Birth Centenary) পালন করছি। শতবর্ষের আলোয় দাঁড়িয়ে আজ আমরা অনুভব করি, তিনি কেবল হাসির খোরাক জোগাননি, তিনি বাংলা শিশুসাহিত্যকে এক নতুন দিগন্তে পৌঁছে দিয়েছেন।
নারায়ণ দেবনাথ জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন:
১৯২৫ সালের ২৫শে নভেম্বর (ভিডিওতে ২৫শে জানুয়ারি বলা হলেও সঠিক তারিখ ২৫শে নভেম্বর), হাওড়া জেলার শিবপুরে এক স্বর্ণশিল্পী পরিবারে নারায়ণ দেবনাথ জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব কেটেছে শিবপুরেই। ছোটবেলা থেকেই পারিবারিক অলংকারের নকশা বা ডিজাইন তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। আঁকিবুঁকির প্রতি ছিল তাঁর অদম্য নেশা। পারিপার্শ্বিক সমাজজীবন, মানুষের আচরণ এবং শিশুদের মনস্তত্ত্ব তিনি খুব ছোট থেকেই খেয়াল করতেন। পরবর্তীকালে তিনি ‘ইন্ডিয়ান আর্ট কলেজ’ থেকে প্রথাগত শিল্পশিক্ষা গ্রহণ করেন, যা তাঁর সৃজনশীলতাকে আরও ধারালো ও পরিণত করে তুলেছিল।
কর্মজীবন ও বাংলা কমিক্সের যুগস্রষ্টা:
শিল্পশিক্ষা শেষ করার পর প্রথমে তিনি বিভিন্ন বইয়ের প্রচ্ছদ, অলংকরণ ও লোগো ডিজাইনের কাজ করতেন। কিন্তু তিনি ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন বাংলা কমিক্সের জনক হিসেবে। নারায়ণ দেবনাথের আগে বাংলা সাহিত্যে কমিক্সের ধারাটি সেভাবে সুসংগঠিত ছিল না। তিনি কমিক্সকে কেবল বিনোদনের মাধ্যম হিসেবেই রাখেননি, সেটিকে একটি স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী সাহিত্যধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর হাত ধরেই ‘দেব সাহিত্য কুটির’-এর পত্রিকাগুলো (যেমন—শুকতারা) জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছায়।
নারায়ণ দেবনাথ অমর সৃষ্টি ও চরিত্রসমূহ:
নারায়ণ দেবনাথের সৃষ্ট চরিত্রগুলো আজও আবালবৃদ্ধবনিতার প্রিয়। শতবর্ষের আলোয় এই চরিত্রগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম:
- হাঁদা ভোঁদা: ১৯৬২ সালে শুরু হওয়া এই কমিক্সে গ্রামবাংলার দুই কিশোরের খুনসুটি, সরলতা এবং নির্দোষ মজার ছবি ফুটে ওঠে। টানা ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি এটি চালিয়ে গিয়ে বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন।
- বাঁটুল দি গ্রেট: ১৯৬৫ সালে তিনি সৃষ্টি করেন বাঙালির একমাত্র সুপারহিরো ‘বাঁটুল’। গোলাপি স্যান্ডো গেঞ্জি পরা, গুলি ফস্কে যাওয়া এই বাঁটুল ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সময় কামানের গোলা হাতে লুফে নিয়ে পাঠকদের সাহস জুগিয়েছিল।
- নন্টে ফন্টে: ১৯৬৯ সালে ‘কিশোর ভারতী’ পত্রিকায় শুরু হয় নন্টে ফন্টে। হোস্টেল জীবনের দুষ্টুমি, কেল্টুদার শয়তানি আর সুপারিনটেনডেন্ট স্যারের বকুনি—ছাত্রজীবনের এক নিখুঁত ও মজাদার দলিল এই কমিক্স।

শিল্পশৈলী ও ভাষাশৈলী:
নারায়ণ দেবনাথের কমিক্সের প্রধান শক্তি ছিল তাঁর সহজ-সরল উপস্থাপনা। তাঁর ভাষা ছিল একদম আমাদের মুখের ভাষার মতো—সাবলীল ও ঘরোয়া। তাঁর আঁকার রেখা ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট ও গতিময়। অল্প রেখায় এবং ‘ধুস’, ‘ডিশুম’, ‘ইয়াহু’র মতো শব্দের ব্যবহারে তিনি যে কৌতুক তৈরি করতেন, তা ছিল অনবদ্য। তিনি নিজেই গল্প ভাবতেন, ছবি আঁকতেন এবং ছড়ার ছন্দে সংলাপ লিখতেন—যা বাংলা সাহিত্যে বিরল।
সমাজ চেতনা ও শিক্ষামূলক দিক:
আপাতদৃষ্টিতে তাঁর কমিক্সগুলো হাসির মনে হলেও, এর গভীরে ছিল এক প্রবল সমাজচেতনা। ভণ্ডামি, কুসংস্কার, লোভ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি ব্যঙ্গ করেছেন তাঁর কার্টুনের মাধ্যমে। হাসির আড়ালে তিনি শিশুদের সততা, বন্ধুত্ব, শৃঙ্খলা এবং মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা দিয়েছেন। দুষ্টুমি থাকলেও তাঁর কোনো চরিত্রই কখনও অশালীন বা কুরুচিকর ছিল না, যা সুস্থ সংস্কৃতির পরিচায়ক।
প্রজন্মান্তরের জনপ্রিয়তা ও শতবর্ষের মূল্যায়ন:
নারায়ণ দেবনাথ হলেন সেই বিরল শিল্পী, যার সৃষ্টি বাবা এবং ছেলে—উভয়েই সমান আগ্রহে পড়ে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাঁর জনপ্রিয়তা বিন্দুমাত্র কমেনি। জন্মশতবর্ষে দাঁড়িয়ে তাঁকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে দেখা যায়, তিনি কেবল একটি যুগের শিল্পী নন, তিনি নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান। আজকের ডিজিটাল যুগেও ‘বাঁটুল’ বা ‘নন্টে ফন্টে’র আবেদন অমলিন। তিনি প্রমাণ করেছেন, প্রযুক্তি বদলালেও বাঙালির হাসির রুচি বদলায়নি।
পুরস্কার ও সম্মাননা:
দীর্ঘ শিল্পজীবনে তিনি বহু সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। ২০১৩ সালে তিনি ‘সাহিত্য একাডেমি’ পুরস্কার পান। পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে ‘বঙ্গবিভূষণ’ সম্মানে ভূষিত করে। এবং ২০২১ সালে ভারত সরকার তাঁকে সম্মানজনক ‘পদ্মশ্রী’ উপাধিতে ভূষিত করে তাঁর অবদানের স্বীকৃতি দেয়।
উপসংহার:
২০২২ সালের ১৮ই জানুয়ারি এই মহান জীবনশিল্পীর মহাপ্রয়াণ ঘটে। কিন্তু নশ্বর দেহের মৃত্যু হলেও শিল্পী নারায়ণ দেবনাথ মৃত্যুহীন। শতবর্ষের আলোয় আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি সেই জাদুকরকে, যিনি আমাদের শৈশবকে আগলে রেখেছেন। যতদিন বাংলা ভাষা থাকবে, যতদিন বাঙালির মুখে হাসি থাকবে, ততদিন নারায়ণ দেবনাথ এবং তাঁর সৃষ্টি আমাদের হৃদয়ের মণিকোঠায় অমর হয়ে থাকবে।




