শতবর্ষে কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী জীবনী রচনা | নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী প্রবন্ধ রচনা

Arindam Saha

Published On:

আজকে তোমাদের পরীক্ষার জন্য শতবর্ষে কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী: জীবন ও সাহিত্যকীর্তি শীর্ষক একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ রচনা তুলে ধরা হল। বাংলা সাহিত্যের আধুনিক ধারার এই অন্যতম প্রধান কবিকে কেন্দ্র করে রচিত প্রবন্ধটি পরীক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত উপযোগী। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক সহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় এই বিষয়টি বারবার আসার সম্ভাবনা থাকে। তাই ছাত্রছাত্রীদের প্রস্তুতির সুবিধার জন্য সহজ, প্রাঞ্জল ও পরীক্ষামুখী ভাষায় এই প্রবন্ধটি উপস্থাপন করা হয়েছে। তোমরা এখান থেকে এটি মনোযোগ দিয়ে পড়ে নিতে পারো অথবা প্রয়োজনে সংগ্রহ করে রাখতে পারো।

প্রবন্ধ রচনা: শতবর্ষে কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

রবীন্দ্র-পরবর্তী বাংলা কবিতার আকাশে যাঁরা ধ্রুবতারার মতো উজ্জ্বল, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী তাঁদের অন্যতম। তিনি কেবল কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন ছন্দের জাদুকর। কঠিন সব কথাকে তিনি অত্যন্ত সহজ ও ঘরোয়া ভাষায় কবিতার রূপ দিতেন। ২০২৪ সালে আমরা এই মহান কবির জন্মশতবর্ষ (১৯২৪-২০২৪) উদযাপন করেছি। শতবর্ষ পেরিয়ে এসেও তাঁর কবিতা আজও আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়, আমাদের প্রশ্ন করতে শেখায়— “রাজা, তোর কাপড় কোথায়?”

জন্ম ও শৈশব

১৯২৪ সালের ১৯শে অক্টোবর, অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুর জেলার চান্দ্রা গ্রামে (বর্তমান বাংলাদেশ) কবি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম জিতেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, যিনি ছিলেন ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক এবং মাতা প্রফুল্লনলিনী দেবী। কবির শৈশব কেটেছে পূর্ববঙ্গের প্রকৃতির কোলে—গ্রামের নদী, মাঠ আর সাদামাটা জীবন তাঁর শিশুমনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। এই গ্রামীণ স্মৃতিই পরবর্তীকালে তাঁর কবিতার ‘নস্টালজিয়া’ হয়ে ফিরে এসেছে।

Read More:  শতবর্ষের আলোকে সুকান্ত ভট্টাচার্য | বাংলা প্রবন্ধ রচনা

শিক্ষাজীবন

গ্রামের পাঠশালায় তাঁর হাতেখড়ি হয়। ১৯৩০ সালে তিনি স্থায়ীভাবে কলকাতায় চলে আসেন। কলকাতায় এসে তিনি প্রথমে মিত্র ইনস্টিটিউশন এবং পরে বঙ্গবাসী কলেজে পড়াশোনা করেন। পরবর্তীকালে তিনি সেন্ট পলস কলেজ থেকে ইতিহাসে বি.এ (স্নাতক) ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তাঁর মধ্যে সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ জন্মেছিল।

কর্মজীবন ও সাংবাদিকতা

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কর্মজীবন ছিল অত্যন্ত বর্ণময়। ছাত্রাবস্থায় ‘শ্রীহর্ষ’ পত্রিকা সম্পাদনার মধ্য দিয়ে তাঁর সাংবাদিকতার সূচনা। এরপর ‘দৈনিক প্রত্যহ’ ও ‘সত্যযুগ’ পত্রিকায় কাজ করার পর তিনি দীর্ঘদিন ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’-র সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে তাঁর অন্যতম বড় কীর্তি হলো ছোটদের পত্রিকা ‘আনন্দমেলা’-র সম্পাদনা। দীর্ঘকাল ধরে তিনি এই পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং শিশু-কিশোরদের মনের মতো সাহিত্য উপহার দিয়েছেন।

সাহিত্যকীর্তি ও কাব্যপ্রতিভা

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ‘স্বচ্ছতা’ ও ‘সহজ ভাষা’। তিনি বিশ্বাস করতেন, কবিতা হতে হবে এমন যা সবাই বুঝতে পারে।

  • কাব্যগ্রন্থ: ১৯৫৪ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নীল নির্জন’। এরপর একে একে ‘অন্ধকার বারান্দা’, ‘নিরক্ত করবী’, ‘সময় বড় কম’, ‘ঘুমিয়ে পড়ার আগে’ ইত্যাদি কালজয়ী কাব্যগ্রন্থ তিনি রচনা করেন।
  • বিখ্যাত সৃষ্টি: তাঁর লেখা ‘অমলকান্তি’ কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের এক অবিস্মরণীয় সৃষ্টি। যে ছেলেটি রোদ্দুর হতে চেয়েছিল, সেই অমলকান্তির মধ্য দিয়ে কবি মধ্যবিত্ত জীবনের স্বপ্নভঙ্গের বেদনা ফুটিয়ে তুলেছেন।

উলঙ্গ রাজা ও সমাজচেতনা

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর সাহিত্যজীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো ‘উলঙ্গ রাজা’ কাব্যগ্রন্থ। এই বইয়ের নাম-কবিতায় তিনি এক শিশুর সরলতায় শাসকের অন্যায়ের বিরুদ্ধে আঙুল তুলেছিলেন। সামন্ততান্ত্রিক বা রাজনৈতিক ভণ্ডামির মুখোশ খুলে দেওয়ার জন্য এই কবিতাটি আজও প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

Read More:  শতবর্ষে নারায়ণ দেবনাথ প্রবন্ধ রচনা | নারায়ন দেবনাথ এর জীবনী রচনা

শিশুসাহিত্য ও গোয়েন্দা গল্প

বড়দের পাশাপাশি ছোটদের জন্যও তিনি দুহাত ভরে লিখেছেন। তাঁর রচিত ছড়াগুলো—যেমন ‘ভোরের পাখি’, ‘খোকনের খাতা’—শিশুদের মুখে মুখে ফেরে। এছাড়া কিশোর সাহিত্যে তাঁর সৃষ্ট গোয়েন্দা চরিত্র এবং রহস্য রোমাঞ্চকর গল্প (যেমন—‘লকারের চাবি’, ‘একটি হত্যার অন্তরালে’) আজও সমান জনপ্রিয়।

ভাষাচর্চা

কেবল সাহিত্য রচনা নয়, বাংলা ভাষা ও বানান নিয়েও তিনি গভীর গবেষণা করেছেন। তাঁর লেখা ‘বাংলা কী লিখবেন কেন লিখবেন’ বইটি বাংলা ব্যাকরণ ও বানানের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের কাছে একটি নির্ভরযোগ্য গাইডবুক।

পুরস্কার ও সম্মাননা

সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ১৯৭৪ সালে ‘উলঙ্গ রাজা’ কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি ভারতের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান ‘সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার’ লাভ করেন। এছাড়াও তিনি ‘আনন্দ শিরোমণি’, ‘বিদ্যাসাগর পুরস্কার’, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ‘বঙ্গবিভূষণ’ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্মানিক ডি.লিট উপাধিতে ভূষিত হন।

উপসংহার

২০১৮ সালের ২৫শে ডিসেম্বর, বড়দিনের দুপুরে ৯৪ বছর বয়সে এই মহান কবি আমাদের ছেড়ে চিরবিদায় নেন। কিন্তু মৃত্যু তাঁকে শেষ করতে পারেনি। ২০২৪ সালে দাঁড়িয়ে, তাঁর জন্মশতবর্ষে আমরা অনুভব করি—তিনি আজও কতটা প্রাসঙ্গিক। বর্তমান সময়ের অস্থিরতায় তাঁর কবিতার সেই সাহসী উচ্চারণ আমাদের সত্য কথা বলার সাহস যোগায়। যতদিন বাংলা ভাষা থাকবে, ততদিন ‘অমলকান্তি’র স্রষ্টা নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী বাঙালির হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবেন।

শিক্ষা সংক্রান্ত আপডেট, সরকারি ও বেসরকারি চাকরির খবর, পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি এবং প্রয়োজনীয় স্টাডি মেটিরিয়াল—সবকিছু এক জায়গায়, নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্যভাবে পেতে আমাদের ওয়েবসাইট karmasangsthan24.in নিয়মিত ফলো করুন। তা ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ নোটিস ও দ্রুত আপডেট মিস না করতে আমাদের WhatsApp ও Telegram গ্রুপে যুক্ত থাকুন।

Leave a Comment