আজকে তোমাদের পরীক্ষার জন্য ঋত্বিক ঘটক – জীবনী রচনা তুলে ধরা হল, যা মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ভীষণভাবে সহায়ক। ভারতীয় চলচ্চিত্র ও সাহিত্য-সংস্কৃতির ইতিহাসে ঋত্বিক ঘটক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নাম। তাঁর জীবন, চিন্তাধারা ও সৃষ্টিকর্ম বারবার পরীক্ষায় প্রশ্ন হিসেবে আসে। তাই এই প্রবন্ধটি মনোযোগ দিয়ে পড়লে যেমন পরীক্ষার উত্তর লেখার প্রস্তুতি মজবুত হবে, তেমনি বিষয়টি সহজে মনে রাখতেও সুবিধা হবে। প্রয়োজনে এখান থেকে পড়ে নিতে বা সংগ্রহ করেও রাখতে পারো।
প্রবন্ধ রচনা: ঋত্বিক ঘটক
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তিনি ছিলেন এক জ্বলন্ত ধুমকেতু। তিনি বিশ্বাস করতেন— “ফিল্ম মানে ফুল নয়, অস্ত্র।” তিনি আর কেউ নন, তিনি হলেন ঋত্বিক কুমার ঘটক। সত্যজিৎ রায় ও মৃণাল সেনের সমসাময়িক হয়েও তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। তাঁর ছবি মানেই নিছক বিনোদন নয়, তাঁর ছবি হলো সময়ের দলিল, দেশভাগের যন্ত্রণা এবং মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই। তিনি বলেছিলেন, “আর্ট মানে আমার কাছে যুদ্ধ।” আজীবন তিনি সেই যুদ্ধই করে গেছেন সেলুলয়েডের ফিতায়।
জন্ম ও বংশপরিচয়
১৯২৫ সালের ৪ঠা নভেম্বর, অবিভক্ত বাংলার ঢাকা শহরের ঋষিকেশ দাস লেনের এক ঐতিহ্যবাহী পরিবারে ঋত্বিক ঘটক জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল পাবনা জেলায়, তবে বেড়ে ওঠা এবং পড়াশোনা রাজশাহীর মিয়াপাড়ায়। পিতা সুরেশচন্দ্র ঘটক ছিলেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এবং মাতা ছিলেন ওজস্বিনী নারী ইন্দুবালা দেবী। বাবা-মায়ের ১১তম এবং কনিষ্ঠতম সন্তান ছিলেন ঋত্বিক। তাঁর বড়দা মণীশ ঘটক ছিলেন সেকালের বিখ্যাত সাহিত্যিক। সাংস্কৃতিক ও শিক্ষিত পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে ওঠাই ঋত্বিকের শিল্পীসত্তাকে শৈশবে পুষ্ট করেছিল।
শিক্ষা ও দেশভাগের ট্র্যাজেডি
ঋত্বিক ঘটকের শিক্ষাজীবন শুরু হয় ময়মনসিংহে। পরে ১৯৪৬ সালে তিনি রাজশাহী কলেজ থেকে আই.এ পাশ করেন। কিন্তু ১৯৪৭ সালের দেশভাগ তাঁর জীবনে এক ভয়াবহ বিপর্যয় নিয়ে আসে। ভিটেমাটি হারিয়ে ছিন্নমূল ও রিফিউজি হয়ে পরিবারের সঙ্গে তাঁকে কলকাতায় চলে আসতে হয়। নিজের চোখের সামনে দেখা এই ‘উদ্বাস্তু সমস্যা’ এবং অস্তিত্বের সংকট তাঁর মনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল। পরবর্তীকালে বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে বি.এ পাশ করলেও, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.এ পড়ার সময় তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছেড়ে পুরোপুরি শিল্পচর্চায় আত্মনিয়োগ করেন।
নাট্য আন্দোলন ও সাহিত্যচর্চা
চলচ্চিত্রে আসার আগে ঋত্বিক ঘটক ছিলেন একজন শক্তিশালী লেখক ও নাট্যকর্মী। ১৯৪৭ সালে তিনি ‘অভিধারা’ পত্রিকা সম্পাদনা করেন এবং সেখানেই তাঁর প্রথম গল্প ‘অয়নান্ত’ প্রকাশিত হয়। ১৯৪৮ সালে তিনি লেখেন তাঁর প্রথম নাটক ‘কালো সায়র’। ১৯৫১ সালে তিনি ‘ভারতীয় গণনাট্য সংঘ’ বা IPTA-তে যোগ দেন। সেখানে ‘দলিল’, ‘জ্বালা’, ‘অফিসার’ প্রভৃতি নাটকে তিনি অভিনয় ও পরিচালনা করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, নাটক বা শিল্প হলো শোষিত মানুষের কথা বলার মাধ্যম।
চলচ্চিত্র জীবন ও দর্শন
ঋত্বিক ঘটকের কাছে সিনেমা ছিল মানুষের কাছে পৌঁছানোর সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন— “সিনেমা বানিয়ে যদি জনগণের কথা না বলতে পারতাম… তাহলে কবেই সিনেমার পোঁদে লাত মেরে চলে যেতাম…!”
- প্রথম পদক্ষেপ: ১৯৫১ সালে নিমাই ঘোষের ‘ছিন্নমূল’ ছবিতে তিনি অভিনেতা ও সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৫২ সালে তিনি তৈরি করেন তাঁর প্রথম ছবি ‘নাগরিক’, যা বাংলা তথা ভারতীয় আর্ট ফিল্মের পথিকৃৎ। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ছবিটি তাঁর মৃত্যুর পর মুক্তি পায়।
- অযান্ত্রিক: ১৯৫৮ সালে মুক্তি পায় তাঁর পরিচালিত ‘অযান্ত্রিক’। এখানে তিনি এক ট্যাক্সি ড্রাইভার বিমল এবং তাঁর গাড়ি ‘জগদ্দল’-এর মধ্যে এক অদ্ভুত মানবিক সম্পর্ক ফুটিয়ে তোলেন। সমালোচকদের মতে এটি তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি।
দেশভাগ ট্রিলজি (ত্রয়ী চলচ্চিত্র)
ঋত্বিক ঘটকের সৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু ছিল দেশভাগের যন্ত্রণা। ষাটের দশকে তিনি পরপর তিনটি ছবি তৈরি করেন, যা ‘দেশভাগ ট্রিলজি’ নামে খ্যাত:
১. মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০): এই ছবির নায়িকা নীতার সেই বিখ্যাত সংলাপ— “দাদা, আমি বাঁচতে চাই” আজও বাঙালির হৃদয়ে হাহাকার তোলে।
২. কোমল গান্ধার (১৯৬১): দুই বাংলার বিভাজন এবং সাংস্কৃতিক ঐক্যের কথা এই ছবিতে উঠে এসেছে।
৩. সুবর্ণরেখা (১৯৬৫): দেশভাগের প্রেক্ষাপটে ভাই-বোনের সম্পর্ক এবং নতুন করে বাঁচার লড়াইয়ের গল্প এই ছবি। তিনি কেবল ঘটনা দেখাননি, দেশভাগের ফলে মানুষের মনের ভেতর যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা তিনি তাঁর নিজস্ব শৈলীতে তুলে ধরেছিলেন।
মহাকাব্যিক সৃষ্টি ও শেষ জীবন
১৯৭৩ সালে অদ্বৈত মল্লবর্মণের উপন্যাস অবলম্বনে তিনি তৈরি করেন ‘তিতাস একটি নদীর নাম’। ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত এই ছবিতে জেলে সমাজের জীবনসংগ্রাম এক মহাকাব্যিক রূপ পেয়েছে। তিতাস সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন— “তিতাস ছিল আমার স্বপ্ন। আমার মতো মমতা নিয়ে এই কাহিনীকে কেউ তুলে ধরতে আগ্রহী হতেন না।” তাঁর শেষ ছবি ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’ (১৯৭৪) ছিল অনেকটা আত্মজীবনীমূলক। এখানে তিনি নিজেই নীলকণ্ঠ চরিত্রে অভিনয় করেন এবং ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, নকশাল আন্দোলন ও সমসাময়িক রাজনীতিকে নির্মমভাবে সমালোচনা করেন। এই ছবির সেই বিখ্যাত সংলাপ— “ভাবো, ভাবো, ভাবা প্র্যাকটিস করো” আজও তরুণ প্রজন্মের মন্ত্র।
পুরস্কার ও সম্মাননা
জীবিত অবস্থায় তিনি হয়তো অর্থের মুখ দেখেননি, কিন্তু সম্মান পেয়েছেন প্রচুর।
- ১৯৫৭ সালে ‘মুসাফির’ ছবির জন্য জাতীয় পুরস্কার।
- ১৯৭০ সালে ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মশ্রী’ উপাধিতে ভূষিত করে।
- ১৯৭৪ সালে ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’-র জন্য শ্রেষ্ঠ কাহিনীকার হিসেবে জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়াও তিনি পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটে (FTII) উপাধ্যক্ষ হিসেবে বহু প্রতিভাবান ছাত্র তৈরি করে গেছেন, যাঁরা পরবর্তীকালে ভারতীয় সিনেমাকে সমৃদ্ধ করেছেন।
উপসংহার
রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “সত্য ছাড়া শিল্প সম্পূর্ণ হয় না।” ঋত্বিক ঘটক ছিলেন সেই সত্যের পূজারী। তিনি দর্শককে সস্তা আনন্দ দিতে চাননি, তিনি চেয়েছিলেন দর্শককে ধাক্কা দিয়ে জাগিয়ে তুলতে। অতিরিক্ত মদ্যপান এবং মানসিক অবসাদে মাত্র ৫০ বছর বয়সে ১৯৭৬ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি এই মহান শিল্পী লোকান্তরিত হন। আজ শতবর্ষ পরে দাঁড়িয়েও তিনি সমান প্রাসঙ্গিক। তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন—সিনেমা কেবল বিনোদন নয়, তা প্রতিবাদের হাতিয়ার, তা সমাজ বদলানোর অস্ত্র।
শিক্ষা সংক্রান্ত আপডেট, সরকারি ও বেসরকারি চাকরির খবর, পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি এবং প্রয়োজনীয় স্টাডি মেটিরিয়াল—সবকিছু এক জায়গায়, নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্যভাবে পেতে আমাদের ওয়েবসাইট karmasangsthan24.in নিয়মিত ফলো করুন। তা ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ নোটিস ও দ্রুত আপডেট মিস না করতে আমাদের WhatsApp ও Telegram গ্রুপে যুক্ত থাকুন।



