সলিল চৌধুরী – জীবনী রচনা | সলিল চৌধুরী প্রবন্ধ রচনা

Arindam Saha

Published On:

ক্লাস ১২-এর পরীক্ষায় জীবনীমূলক প্রবন্ধ রচনা লিখলে তুলনামূলকভাবে সহজেই ভালো নম্বর পাওয়া যায়। সেই কথা মাথায় রেখে আজকে তোমাদের পরীক্ষার জন্য সলিল চৌধুরী – জীবনী রচনা তুলে ধরা হল, যা তোমাদের পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সরাসরি কাজে লাগবে। সাহিত্য, সংগীত ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে সলিল চৌধুরীর নাম বারবার উঠে আসে, তাই এই রচনাটি পরীক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সহজ ও বোধগম্য ভাষায় লেখা এই প্রবন্ধটি তোমরা এখান থেকেই পড়ে নিতে পারো অথবা সংগ্রহ করে রাখলে রিভিশনের সময় বিশেষ সুবিধা হবে।

সলিল চৌধুরী প্রবন্ধ রচনা

বাংলা সংগীত জগতের আকাশে সলিল চৌধুরী কেবল একটি নাম নন, তিনি এক উজ্জ্বলতম নক্ষত্র। তিনি একাধারে সুরস্রষ্টা, গীতিকার, কবি, সাহিত্যিক এবং চলচ্চিত্র পরিচালক। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের পর বাংলা গানে এমন বহুমুখী প্রতিভার জাদুকরী স্পর্শ আর কেউ দিতে পারেননি। পাশ্চাত্য সিম্ফনির সঙ্গে বাংলার লোকজ সুরের এমন অপূর্ব মেলবন্ধন তাঁর আগে ছিল অকল্পনীয়। বিপ্লব, প্রেম এবং সমাজ সচেতনতা—এই তিনের ত্রিবেণী সঙ্গম ঘটেছিল তাঁর সৃষ্টিতে। আজ তাঁর জন্মশতবর্ষে দাঁড়িয়ে আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি সেই মহান শিল্পীকে, যাঁকে সবাই ভালোবেসে ডাকে ‘সলিল দা’।

জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন:

১৯২৫ সালের ১৯শে নভেম্বর, দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুর-রাজপুর অঞ্চলের এক সম্ভ্রান্ত বাঙালি কায়স্থ পরিবারে সলিল চৌধুরী জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা জ্ঞানেন্দ্র চৌধুরী ছিলেন ব্রিটিশ চা বাগানের চিকিৎসক এবং সংগীতের একনিষ্ঠ অনুরাগী। বাবার কাছেই সলিল চৌধুরীর সংগীতে হাতেখড়ি। তাঁর শৈশবের একটা বড় অংশ কেটেছে অসমের চা বাগানে। চা বাগানের কুলিদের জীবনযাত্রা, তাঁদের সুখ-দুঃখ, বঞ্চনা এবং তাঁদের লোকগানের সুর শিশু সলিলকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। সেই শৈশবের অভিজ্ঞতাই পরবর্তীকালে তাঁর গানে সাধারণ মানুষের কথা হয়ে ফুটে উঠেছে।

আরও পড়ুন: ঋত্বিক ঘটক প্রবন্ধ রচনা Class 12 | ঋত্বিক ঘটক জীবনী রচনা

শিক্ষাজীবন ও রাজনৈতিক চেতনা:

সলিল চৌধুরীর শিক্ষাজীবন শুরু হয় দক্ষিণ ২৪ পরগনার সুভাষগ্রামে মামাবাড়িতে। হারিনাভি বিদ্যালয় থেকে তিনি প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন এবং উচ্চমাধ্যমিক (আই.এস.সি) পাশ করেন। এরপর তিনি কলকাতার বিখ্যাত বঙ্গবাসী কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে স্নাতক (বি.এ) ডিগ্রি লাভ করেন। কলেজ জীবনেই তাঁর রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ ঘটে। তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক শাখা ‘ভারতীয় গণনাট্য সংঘ’ বা IPTA-র সঙ্গে যুক্ত হন। দেশভাগ, দুর্ভিক্ষ এবং ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন তাঁকে চঞ্চল করে তুলেছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, গান কেবল বিনোদনের জন্য নয়, গান হলো প্রতিবাদের হাতিয়ার।

Read More:  বেগম রোকেয়া – জীবনী রচনা | Begum Rokeya Jiboni

সংগীত জীবন ও গণসংগীতের জোয়ার:

সলিল চৌধুরীর সংগীত জীবন ছিল বৈচিত্র্যে ভরা। একে কয়েকটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়:

গণসংগীত: ১৯৪৪ সালে গণনাট্য সংঘে যোগ দেওয়ার পর তিনি গানের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে জাগিয়ে তোলার ব্রত নেন। তাঁর লেখা ও সুর করা ‘বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা’, ‘রানার’, ‘অবাক পৃথিবী’, ‘ঢেউ উঠছে কারা টুটছে’ গানগুলো আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল। এই গানগুলিতে তিনি পাশ্চাত্যের হারমোনি এবং কোরাস গানের যে ব্যবহার করেছিলেন, তা ছিল বাংলা গানে একদম নতুন।

আধুনিক বাংলা গান: হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে তাঁর সুর করা ‘গাঁয়ের বধূ’, ‘পালকির গান’, ‘পথ হারাবো বলেই এবার’ বাংলা আধুনিক গানের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। গিটার, বেহালা, পিয়ানো, বাঁশি এবং ড্রামসের এমন অর্কেস্ট্রেশন বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার আগে শোনা যায়নি।

আরও পড়ুন: আমার জীবনের লক্ষ্য: আদর্শ কৃষক হওয়া (প্রবন্ধ রচনা)

চলচ্চিত্র সংগীত: ১৯৪৯ সালে ‘পরিবর্তন’ ছবির মাধ্যমে তিনি চলচ্চিত্র সংগীত পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯৫৩ সালে বিমল রায়ের বিখ্যাত হিন্দি ছবি ‘দো বিঘা জমিন’-এর মাধ্যমে তিনি সর্বভারতীয় স্তরে পরিচিতি পান। তিনি প্রায় ৭৫টি হিন্দি, ৪০টি বাংলা এবং ২৬টি মালয়ালম ছবিতে সুর দিয়েছেন। মালয়ালম ছবি ‘চেম্মিন’-এর সংগীত পরিচালনা তাঁকে দক্ষিণ ভারতেও অমর করে রেখেছে। ‘আনন্দ’, ‘মধুমতী’, ‘পরখ’ প্রভৃতি হিন্দি ছবির গান আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে।

সাহিত্যিক ও পরিচালক সত্তা:

সলিল চৌধুরী কেবল সুরকার ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন শক্তিশালী সাহিত্যিক। তাঁর লেখনীতে সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা এবং জীবন সংগ্রামের ছবি ফুটে উঠত। তাঁর লেখা ছোটগল্প ‘ড্রেসিং টেবিল’ এবং নাটকগুলো সাহিত্যমূল্যে অনন্য। তাঁর লেখা গল্প ‘রিকশাওয়ালা’ অবলম্বনেই তৈরি হয়েছিল কালজয়ী সিনেমা ‘দো বিঘা জমিন’। এছাড়াও তিনি ‘চিন্না মূল’ ও ‘পিনজরে কে পঞ্ছী’-র মতো নাটক লিখেছেন যা তাঁর বিপ্লবী চেতনার পরিচয় দেয়।

Read More:  বাংলার উৎসব: ধর্মীয়, ঋতুভিত্তিক ও সামাজিক উৎসব নিয়ে প্রবন্ধ রচনা

পুরস্কার ও সম্মাননা:

সংগীত ও সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি জীবদ্দশায় বহু সম্মান ও পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ১৯৫৮ সালে ‘মধুমতী’ ছবির জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালকের ‘ফিল্মফেয়ার’ পুরস্কার পান।

১৯৮৮ সালে তিনি সম্মানজনক ‘সংগীত নাটক আকাদেমি’ পুরস্কার লাভ করেন। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় পুরস্কার হলো সাধারণ মানুষের ভালোবাসা। তাঁর বন্ধু ও সাহিত্যিক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় যথার্থই বলেছিলেন—

“সলিল একজন পূর্ণকালের লেখক এবং সংগীতশিল্পী, যিনি সৃষ্টির উৎসকে কখনও হারাননি।”

উপসংহার

১৯৯৫ সালের ৫ই সেপ্টেম্বর এই মহান সুরকার পৃথিবীকে চিরবিদায় জানান। কিন্তু মৃত্যু তাঁকে শেষ করতে পারেনি। তাঁর সৃষ্টি করা ‘ও আলোর পথযাত্রী’ বা ‘মানবো না বন্ধনে’ গানগুলো আজও যেকোনো মিছিলে বা উৎসবে সমান প্রাসঙ্গিক। তিনি দেখিয়ে দিয়ে গেছেন কীভাবে সুরের মাধ্যমে দেশ ও সমাজের কথা বলা যায়। জন্মশতবর্ষে দাঁড়িয়ে আমরা নিঃসঙ্কোচে বলতে পারি—রবীন্দ্রনাথ বা নজরুলের পরে সলিল চৌধুরীর মতো এমন বহুমুখী ও বিশ্বমানের প্রতিভা বাংলা সংগীত জগতে সত্যিই বিরল। তাঁর সুরের জাদুতে তিনি অনন্তকাল বাঙালির হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন।

Leave a Comment