সত্যজিৎ রায় জীবনী রচনা – Satyajit Ray Biography in Bengali

Arindam Saha

Published On:

আজকে তোমাদের পরীক্ষার জন্য সত্যজিৎ রায় – জীবনী রচনা তুলে ধরা হলো, যা মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতিতে অত্যন্ত সহায়ক হবে। সাহিত্য, চলচ্চিত্র ও চিত্রকলায় তাঁর অবদান ভারতীয় সংস্কৃতিকে আন্তর্জাতিক স্তরে পরিচিত করেছে। তাই পরীক্ষায় প্রায়ই সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে প্রশ্ন আসে। এই রচনাটি সহজ ভাষায়, পরীক্ষার উপযোগী করে প্রস্তুত করা হয়েছে, যাতে পড়ে বোঝা ও মনে রাখা দুটোই সুবিধাজনক হয়। অতএব এখান থেকে এটি মনোযোগ দিয়ে পড়ে নিতে পারো অথবা নোট হিসেবে সংগ্রহ করে রাখতে পারো।

প্রবন্ধ রচনা: বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরে বাংলার শিল্প-সংস্কৃতির ইতিহাসে যে নাম টি সবচেয়ে উজ্জ্বল, তিনি হলেন সত্যজিৎ রায়। তিনি কেবল একজন চলচ্চিত্র পরিচালক ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক অসামান্য ‘বহুমুখী প্রতিভা’ (Polymath)। সাহিত্য রচনা, ছবি আঁকা, সঙ্গীত পরিচালনা এবং চলচ্চিত্র নির্মাণ—শিল্পের সব ক্ষেত্রেই তাঁর অবাধ বিচরণ ছিল। তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রকে বিশ্বের দরবারে সম্মানের আসনে বসিয়েছিলেন। আকিরা কুরোসাওয়ার মতো বিশ্বখ্যাত পরিচালক তাঁর সম্পর্কে যথার্থই বলেছিলেন— “সত্যজিতের চলচ্চিত্র না দেখা আর পৃথিবীতে বাস করে চন্দ্রসূর্য না দেখা একই কথা।”

জন্ম ও বংশ পরিচয়

১৯২১ খ্রিস্টাব্দের ২রা মে, উত্তর কলকাতার ১০০ নম্বর গড়পার রোডের বিখ্যাত রায়চৌধুরী পরিবারে সত্যজিৎ রায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ধমনীতে ছিল শিল্প ও সাহিত্যের রক্ত। তাঁর পিতামহ ছিলেন শিশুসাহিত্যিক, চিত্রশিল্পী ও মুদ্রণ বিশেষজ্ঞ উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী এবং পিতা ছিলেন বাংলা ছড়াসাহিত্যের জাদুকর ও ‘আবোল তাবোল’-এর স্রষ্টা সুকুমার রায়। তাঁর মা ছিলেন সুপ্রভা দেবী। মাত্র আড়াই বছর বয়সে পিতাকে হারিয়ে মায়ের কঠোর সংগ্রাম ও আদর্শে তিনি বড় হয়ে ওঠেন।

Read More:  শতবর্ষে কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী জীবনী রচনা | নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী প্রবন্ধ রচনা

শিক্ষাজীবন ও শান্তিনিকেতন পর্ব

সত্যজিৎ রায়ের শিক্ষাজীবন শুরু হয় বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাইস্কুলে। সেখান থেকে ম্যাট্রিক পাশ করার পর তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে অর্থনীতি নিয়ে ভর্তি হন। স্নাতক হওয়ার পর মায়ের ইচ্ছায় এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবশত তিনি শান্তিনিকেতনের ‘কলাভবনে’ ভর্তি হন। সেখানে নন্দলাল বসু এবং বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের সান্নিধ্যে তাঁর শিল্পচেতনা নতুন রূপ পায়। যদিও প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ শেষ না করেই তিনি কলকাতায় ফিরে আসেন, তবু শান্তিনিকেতনের প্রকৃতি ও শিক্ষা তাঁর পরবর্তী জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

কর্মজীবনের সূচনা ও বিজ্ঞাপন জগত

১৯৪৩ সালে মাত্র ৮০ টাকা বেতনের চাকরিতে ব্রিটিশ বিজ্ঞাপন সংস্থা ‘ডি. জে. কিমার’-এ ‘জুনিয়র ভিজ্যুয়ালাইজার’ হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। বিজ্ঞাপনের কপি লেখা ও ছবি আঁকায় তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। এরপর তিনি বিখ্যাত ‘সিগনেট প্রেস’-এর সঙ্গে যুক্ত হন। সেখানে বইয়ের প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করার সময় তিনি এক নতুন ঘরানার সৃষ্টি করেন। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আম আঁটির ভেঁপু’ বইটির প্রচ্ছদ করার সময়ই ‘পথের পাঁচালী’ নিয়ে সিনেমা তৈরির স্বপ্ন তাঁর মনে দানা বাঁধতে শুরু করে।

চলচ্চিত্র জীবন ও পথের পাঁচালী

১৯৪৭ সালে তিনি চিদানন্দ দাশগুপ্ত ও অন্যান্যদের সঙ্গে মিলে ‘কলকাতা ফিল্ম সোসাইটি’ স্থাপন করেন। এরপর বহু বাধা ও অর্থের অভাব জয় করে ১৯৫৫ সালে মুক্তি পায় তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র ‘পথের পাঁচালী’। এই ছবিটি বাংলা তথা ভারতীয় সিনেমার ইতিহাস ও গতিপথ বদলে দেয়। প্রথাগত স্টুডিওর বাইরে গিয়ে, নতুন মুখ নিয়ে তৈরি এই ছবির ফটোগ্রাফি এক নতুন চিত্রভাষার জন্ম দিল। ১৯৫৭ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটি ‘বেস্ট হিউম্যান ডকুমেন্ট’ পুরস্কার লাভ করে।

Read More:  শতবর্ষে নারায়ণ দেবনাথ প্রবন্ধ রচনা | নারায়ন দেবনাথ এর জীবনী রচনা

চলচ্চিত্রের বিষয়বৈচিত্র্য ও ট্রিলজি

সত্যজিৎ রায়ের সিনেমার বিষয়বস্তু ছিল অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। তাঁর সৃষ্টিকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়:

  • অপু ট্রিলজি: ‘পথের পাঁচালী’র পর তিনি নির্মাণ করেন ‘অপরাজিত’ ও ‘অপুর সংসার’। এই তিনটি ছবি বিশ্ব চলচ্চিত্রে ‘অপু ট্রিলজি’ নামে খ্যাত।
  • সামাজিক ও রাজনৈতিক ছবি: তিনি নির্মাণ করেন ‘জলসাঘর’ (পতনোন্মুখ সামন্ততন্ত্রের কাহিনী), ‘মহানগর’, ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’, ‘জন-অরণ্য’ এবং ‘সীমাবদ্ধ’। এই ছবিগুলিতে মধ্যবিত্ত জীবনের সংকট ও সমাজের অবক্ষয় ফুটে উঠেছে।
  • রবীন্দ্র-সাহিত্য নির্ভর: রবীন্দ্রনাথের ‘নষ্টনীড়’ অবলম্বনে তিনি তৈরি করেন তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি ‘চারুলতা’। এছাড়াও তৈরি করেন ‘ঘরে বাইরে’ ও ‘তিন কন্যা’।
  • শিশু-কিশোর ও ফ্যান্টাসি: ছোটদের জন্য তাঁর অমর সৃষ্টি ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’‘হীরক রাজার দেশে’। আপাত হাসির মোড়কে এই ছবিগুলোতে তিনি যুদ্ধবিরোধী বার্তা ও স্বৈরাচারী শাসনের বিরোধিতা করেছেন। এছাড়াও ‘সোনার কেল্লা’ ও ‘জয়বাবা ফেলুনাথ’-এর মতো গোয়েন্দা ছবিও তিনি উপহার দিয়েছেন।

সাহিত্যিক ও প্রচ্ছদ শিল্পী

সিনেমা তৈরির পাশাপাশি সাহিত্যিক হিসেবেও তিনি ছিলেন অসম্ভব জনপ্রিয়। তিনি ও তাঁর পরিবার মিলে ছোটদের পত্রিকা ‘সন্দেশ’-কে নবজীবন দান করেন। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় দুটি চরিত্র—গোয়েন্দা ‘ফেলুদা’ (প্রদোষ চন্দ্র মিত্র) এবং বিজ্ঞানী ‘প্রফেসর শঙ্কু’ তাঁরই সৃষ্টি। নিজের ছোটবেলার স্মৃতি নিয়ে তিনি লিখেছেন ‘যখন ছোট ছিলাম’। এছাড়াও চলচ্চিত্র বিষয়ক তাঁর প্রবন্ধ সংকলন ‘Our Films, Their Films’ এবং ‘বিষয় চলচ্চিত্র’ বোদ্ধা মহলে সমাদৃত।

পুরস্কার ও বিশ্বস্বীকৃতি

সত্যজিৎ রায় জীবদ্দশায় অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

  • ১৯৮৫ সালে তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ সম্মান ‘দাদাসাহেব ফালকে’ পুরস্কার পান।
  • ১৯৮৭ সালে ফ্রান্স সরকার তাঁকে সে দেশের সর্বোচ্চ সম্মান ‘লিজিয়ন অফ অনার’ প্রদান করে।
  • অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ‘ডিলিট’ উপাধি দেয়।
  • ১৯৯২ সালে মৃত্যুর কিছু দিন আগে তিনি অস্কারের ‘লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট’ (Honorary Academy Award) সম্মান লাভ করেন।
  • ভারত সরকার তাঁকে মরণোত্তর ‘ভারতরত্ন’ সম্মানে ভূষিত করে।
Read More:  শতবর্ষের আলোকে সুকান্ত ভট্টাচার্য | বাংলা প্রবন্ধ রচনা

জীবনাবসান ও উপসংহার

১৯৯২ খ্রিস্টাব্দের ২৩শে এপ্রিল হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে এই মহান মনিষীর জীবনাবসান ঘটে। তাঁর মৃত্যুতে বিশ্ব চলচ্চিত্রে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হয়। সত্যজিৎ রায় ছিলেন আদ্যপান্ত একজন বাঙালি, কিন্তু তাঁর কাজের ব্যাপ্তি ছিল আন্তর্জাতিক। তিনি আমাদের শিখিয়েছিলেন, কীভাবে সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বিশ্বমানের শিল্প সৃষ্টি করা যায়। তাঁর সৃষ্টিরাজি যুগ যুগ ধরে বাঙালির মনন ও চিন্তাকে সমৃদ্ধ করবে।

শিক্ষা সংক্রান্ত আপডেট, সরকারি ও বেসরকারি চাকরির খবর, পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি এবং প্রয়োজনীয় স্টাডি মেটিরিয়াল—সবকিছু এক জায়গায়, নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্যভাবে পেতে আমাদের ওয়েবসাইট karmasangsthan24.in নিয়মিত ফলো করুন। তা ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ নোটিস ও দ্রুত আপডেট মিস না করতে আমাদের WhatsApp ও Telegram গ্রুপে যুক্ত থাকুন।

Leave a Comment